দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছর পর দেশে ফিরে এসেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে এ প্রত্যাবর্তন তার জন্য আনন্দের চেয়ে গভীর শোকের বার্তা নিয়ে এসেছে। ছোট ভাইয়ের মৃত্যু এবং মৃত্যুশয্যায় থাকা মায়ের খবরে ভারাক্রান্ত মন নিয়েই দেশে পা রাখতে হয়েছে তাকে। দেশে ফেরার পরপরই একদিকে পেয়েছেন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, অন্যদিকে তাকে সরাসরি ছুটে যেতে হয়েছে হাসপাতালে, অসুস্থ মাকে দেখতে।
স্বদেশে ফিরে আসার পরপরই তাকে যেতে হয় প্রয়াত ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারতে। মনে হচ্ছিল এখানেই হয়তো বেদনার গল্প শেষ, কিন্তু তা হয়নি। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তাকে শুনতে হয় মায়ের মৃত্যুসংবাদ। এ শোক তাকে আরও নিঃস্ব করে তোলে, ভেঙে দেয় তার মানসিক প্রস্তুতির ছন্দ।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের শুরুতে ছিল প্রাণবন্ত উপস্থিতি—ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের অভিনন্দন গ্রহণ করেন, হাস্যোজ্জ্বল মুখে গ্রহণ করেন সংবর্ধনা। কিন্তু শোকের ছায়া দ্রুতই ঢেকে দেয় তার সেই চেহারা। ছোটবেলায় বাবাকে হারানো তারেক রহমান কৈশোরেই বুঝে গিয়েছিলেন দায়িত্ব কাকে বলে। মা বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকায় নিজেকে নিজেই গড়ে তুলতে হয়। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন, বিশেষত যখন খালেদা জিয়া চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তারেক রহমান জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, শুরু হয় ষড়যন্ত্রের চোরাগলি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা করে। কারাগারে নির্যাতনের শিকার হন তিনি, যা চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়। এরপর তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়।
বেগম খালেদা জিয়া সেই সময় কারাবন্দি থাকলেও জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে দুই ছেলের মুক্তির দাবি করেন। তারেক রহমান ২০০৮ সালের ৩ মার্চ জামিনে মুক্তি পান এবং পরে চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে যান, যেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পান এবং দীর্ঘ ১৭ বছর অবস্থান করেন।
তবে এই নির্বাসনকালের মধ্যে দেশেও ঘটে যায় বহু পরিবর্তন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে একাধিক বিতর্কিত নির্বাচন, গুম-খুন ও রাজনৈতিক মামলার ঘটনা ঘটে। তারেক রহমান নিজেও বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হন। সেই প্রতিকূল পরিবেশে বিদেশ থেকেই দল পরিচালনা করেন তিনি। বিশেষ করে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করার পর তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর একে একে উচ্চ আদালতে চলমান মামলাগুলোতে খালাস পেতে থাকেন তারেক রহমান। যদিও তখনও তার দেশে ফেরার সময় নিয়ে চলছিল নানা জল্পনা-কল্পনা। অবশেষে সব জটিলতা পেরিয়ে ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাভেল পাসে দেশে ফিরেন তিনি।
দেশে ফিরেই পূর্বাচলে বিএনপির বিশাল গণসংবর্ধনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন, জাতিকে জানিয়ে দেন ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা। মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে মানুষের ভালোবাসা গ্রহণ করেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার মাঝেও ছিল বেদনার ভার। কারণ, দেশে ফেরার সময় তার পরিবারের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া। জীবিত ভাই আর নেই, মা মৃত্যুশয্যায়।
স্বদেশে ফিরে প্রথম কয়েক দিনে তারেক রহমান মাকে হাসপাতালে দেখতে যান, বাবার ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। ঠিক তখনই আসে জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা—৩০ ডিসেম্বর মায়ের মৃত্যু। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। মায়ের জানাজা নিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় তার মুখে গভীর শোক ও বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়। বিশাল মানুষের উপস্থিতিতে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সরকার ঘোষিত তিন দিনের শোক এবং দলের ঘোষিত সাত দিনের শোকপর্ব শেষের পথে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ গুলশানে গিয়ে তারেক রহমানের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন, যা কিছুটা হলেও তাকে মানসিক শক্তি জোগাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে পুরো জাতিকেই নিজের পরিবার হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারেক রহমান। ১ জানুয়ারি এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “শোকের এই সময় আমি আমার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে গভীরভাবে স্মরণ করছি। আজ এত মানুষের ভালোবাসা পেয়ে মনে হচ্ছে, আপনজন হারালেও পুরো বাংলাদেশ এখন আমার পরিবার।”
তারেক রহমানের পারিবারিক জীবন বরাবরই কঠিন ছিল। শৈশবে বাবার মৃত্যু, মায়ের দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা, ভাইয়ের অকাল মৃত্যু এবং দেশে ফিরেই মাকে হারানো—সব মিলিয়ে এক দীর্ঘ শোকের ইতিহাস বহন করছেন তিনি।
তবে এই শোকেই নতুন শক্তি খুঁজে নিচ্ছেন তিনি। জনগণের ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মা যেভাবে ৪২ বছর ধরে দলের হাল ধরে রেখেছিলেন, এখন সেই দায়িত্ব পুরোপুরি তার কাঁধে।
নিজের দায়বদ্ধতা ও প্রস্তুতির কথা জানিয়ে ফেসবুক পোস্টে তারেক রহমান লেখেন, “আমার মা সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন। আজ আমি তার সেই দায়িত্ব ও আদর্শকে গভীরভাবে অনুভব করছি। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—মা যেখানে থেমে গিয়েছেন, আমি সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করব। মানুষের ভালোবাসা ও আস্থাই আমাকে অনুপ্রাণিত করছে।










