Home বাংলাদেশ নিরাপত্তাহীনতায় শুধু ভোটার নয়, রাজনীতিবিদরাও

নিরাপত্তাহীনতায় শুধু ভোটার নয়, রাজনীতিবিদরাও

85
0

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ উদ্বেগ শুধু সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজনীতিবিদরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। সম্প্রতি ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাটি এই আশঙ্কাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার’ ওয়েবসাইটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন ও বর্তমান সরকার একটি নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।” তাঁর মতে, বিপন্ন গোষ্ঠী বলতে শুধু সংখ্যালঘু বা আদিবাসী নয়, বর্তমানে রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তাও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

গত দেড় মাসে সারা দেশে অনুষ্ঠিত প্রাক-নির্বাচনী সংলাপ থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে দেবপ্রিয় জানান, প্রায় সব জায়গায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। এসব মতামতের ওপর ভিত্তি করে একটি নাগরিক ইশতেহার প্রস্তুত করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক সংস্কারে শ্লথতা ও চ্যালেঞ্জ

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যে অবক্ষয় ঘটেছে, তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক এবং কর্পোরেট গোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে ওঠা ক্ষমতার সমন্বয়। এর ফলে প্রতিযোগিতাহীন রাজনীতি ও অর্থনীতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশে ‘চামচা পুঁজিবাদ’ এবং পরবর্তীতে এক ধরনের লুটপাটতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষ এই উন্নয়নের পূর্ণ সুফল পায়নি। বর্তমান সংস্কার উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করলেও তিনি বলেন, এর গতি ও স্বচ্ছতা সময়ের সঙ্গে কমে এসেছে। পরিকল্পনার বাইরে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

রাজনীতি, প্রশাসন ও সংস্কারে জটিলতা নিয়ে আলোচনা

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংস্কারে জাতীয় ঐকমত্য থাকলেও বড় বাধা হচ্ছে রাজনীতিক ও আমলাতন্ত্রের প্রভাব। গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটিতেও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে নৌপরিবহন ও শ্রম উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারি কার্যক্রমে দুর্নীতি এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক যে, তাকে দমন করা খুবই কঠিন। তিনি বলেন, সংসদের ৬০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী হওয়ায় নৈতিক রাজনীতি চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারবে না বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ব্যাংকিং খাত ও আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা

অনুষ্ঠানে দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়। মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান জানান, কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৯৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংক খাত সংস্কারে আরও গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে।

সিপিডি চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান বলেন, আইন প্রণয়নের চেয়ে বাস্তবায়নে ব্যর্থতাই বড় সমস্যা। প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সৎ নেতৃত্ব থাকলে বড় সংস্কার ছাড়াও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হয়।

সংসদ সদস্যদের ভূমিকা ও নির্বাচন কমিশনের চ্যালেঞ্জ

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেন, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। এক ব্যক্তিকে সব ক্ষমতা দিলে অনিয়মের ঝুঁকি থেকেই যায়।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, জনগণের আস্থা ফেরানোই এখন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। গত দেড় দশকে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা অনেক কমেছে। মনোনয়ন বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে কমিশন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

অনুষ্ঠানে ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয় এবং পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here