Home এশিয়া পেসিফিক সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার পর বদলে যাচ্ছে কিশোরদের জীবন, তবুও ফাঁক গলে ফিরছে...

সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার পর বদলে যাচ্ছে কিশোরদের জীবন, তবুও ফাঁক গলে ফিরছে অনেকে

21
0

অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য চালু হওয়া কঠোর সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার পাঁচ মাস পর প্রকাশিত নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর-কিশোরী সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে আরেক বাস্তবতা—বেশিরভাগ তরুণ এখনও বিভিন্ন কৌশলে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করছে।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান Growth Intelligence Centre পরিচালিত জরিপে ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৭০০-এর বেশি শিশু ও দুই হাজারের বেশি অভিভাবকের মতামত নেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কিশোর এখন আর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে না। এর মধ্যে ২০ শতাংশ সরাসরি নতুন আইনের কারণে প্ল্যাটফর্ম ছেড়েছে, আর ১৪ শতাংশ জানিয়েছে তারা কখনও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারই করেনি।

জরিপে অংশ নেওয়া তিন-চতুর্থাংশ শিশু জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া কম ব্যবহারের ফলে তারা এখন খেলাধুলা, ব্যায়াম, পড়াশোনা, শিল্পচর্চা, গান কিংবা পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানোর মতো কাজে বেশি মন দিচ্ছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় বিকল্প কার্যক্রম হিসেবে উঠে এসেছে ব্যায়াম ও খেলাধুলা।

গবেষণা অনুযায়ী, শিশুদের গড় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের সময় দৈনিক ২.৪ ঘণ্টা থেকে কমে ১.৯ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট সময় বাঁচছে, যা জাতীয়ভাবে বছরে প্রায় ২৪৪ মিলিয়ন ঘণ্টা সময় ফেরত আসার সমান।

তবে ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি জরিপটি দেখিয়েছে যে দুই-তৃতীয়াংশ কিশোর এখনও বিভিন্ন উপায়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার আগে ৭২ শতাংশ শিশু ইউটিউব ব্যবহার করত, যা এখনো ৬১ শতাংশে রয়েছে। টিকটক ব্যবহারকারী কমে ৫৩ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নেমেছে, আর স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ৩০ শতাংশ হয়েছে। ইনস্টাগ্রামেও ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দুর্বল বয়স যাচাই ব্যবস্থাই এই ব্যর্থতার বড় কারণ। অনেক শিশু জানিয়েছে, তারা অ্যাকাউন্টে বয়স পরিবর্তন করেছে, নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছে বা বড় ভাই-বোন কিংবা অভিভাবকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। কেউ কেউ আবার মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।

ভিক্টোরিয়ার এক বাবা গ্যারি কিরিয়াকু জানান, তার ১১ বছর বয়সী ছেলে নিষেধাজ্ঞার পর টিকটক থেকে বাদ পড়লেও খুব দ্রুত আবার ফিরে আসে। কীভাবে সে এটি করেছে তা তিনি নিশ্চিত নন, তবে ধারণা করছেন পরিবারের বড় কারও সাহায্য পেয়েছে।

তার ভাষায়, “বাসন ধোয়া বা ঘর গোছানো সে ঠিকমতো করতে পারে না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার নিষেধাজ্ঞা কীভাবে পাশ কাটাতে হয় সেটা ঠিকই বের করে ফেলেছে।”

অভিভাবকদের অনেকেই এখন সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম গোপনে নজরদারি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের উদ্বেগ, শিশুরা ফোনে এতটাই ডুবে থাকে যে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

তবে জরিপে কিছু আবেগঘন অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে। এক ১১ বছর বয়সী শিশু প্রধানমন্ত্রী Anthony Albanese-কে চিঠি লিখে ধন্যবাদ জানিয়েছে। শিশুটি লিখেছে, “সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া আমার জীবন অনেক ভালো হয়েছে। আমি এখন বেশি বাইরে যাই, ব্যায়াম করি। ১৬ বছর হওয়ার পরও হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করব না।”

অন্যদিকে অনেক কিশোর আবার সোশ্যাল মিডিয়া না থাকায় একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতির কথাও জানিয়েছে। কেউ কেউ বলেছে, তারা এখন বন্ধুদের আলোচনার বিষয়, মিম বা ট্রেন্ড বুঝতে পারে না এবং নিজেকে ‘আলাদা’ মনে হয়।

জরিপে আরও উঠে এসেছে যে অনেক কিশোর সোশ্যাল মিডিয়াকে “আসক্তিকর”, “অপরিহার্য” বা “জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ” হিসেবে দেখে। এখনও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে এমন শিশুদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্বীকার করেছে যে তারা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট অনুভব করে।

অভিভাবকদের অনেকেই মনে করছেন, এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় সুফল হলো পরিবারে নতুন আলোচনা শুরু হওয়া। অনেক পরিবার এখন স্ক্রিন টাইম, অনলাইন নিরাপত্তা, ভুয়া তথ্য এবং AI-তৈরি কনটেন্ট নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলছে।

তবে অনেকের অভিযোগ, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখনো যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের মতে, প্ল্যাটফর্মগুলোর হাতে ব্যবহারকারীদের বিপুল তথ্য থাকা সত্ত্বেও শিশুদের প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার এই বিশ্বে প্রথম ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা কিছু ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনলেও, এটি একই সঙ্গে নতুন এক বাস্তবতাও সামনে এনেছে—ডিজিটাল যুগে শিশুদের অনলাইন জীবন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here