Home এশিয়া পেসিফিক অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ মুসলিম সংগঠনে ‘গৃহযুদ্ধ’ — বিতর্কের কেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট রতেব জনেইদ

অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ মুসলিম সংগঠনে ‘গৃহযুদ্ধ’ — বিতর্কের কেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট রতেব জনেইদ

22
0

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠন Australian Federation of Islamic Councils (AFIC)-কে ঘিরে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ সংকট ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে এসেছে। সংগঠনটির দীর্ঘদিনের সভাপতি Rateb Jneid এখন নানা অভিযোগ, আর্থিক স্বচ্ছতা বিতর্ক, পারিবারিক দাতব্য সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক এবং নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।

AFIC অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ছাতাসংগঠন। ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা বর্তমানে ১২০টিরও বেশি সদস্য সংগঠনকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং মসজিদ নির্মাণ, ইসলামিক শিক্ষা ও মুসলিম অধিকার নিয়ে কাজ করে। সংস্থাটির সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার এবং বছরে প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন ডলার আয় হয়।

রতেব জনেইদ নিজেকে শুধু ধর্মীয় নেতা হিসেবেই নয়, বরং আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, বিবাহ নিবন্ধক ও সমাজকর্মী হিসেবেও পরিচয় দেন। তার একাধিক মাস্টার্স ডিগ্রি, শিক্ষা বিষয়ে পিএইচডি এবং টোঙ্গার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক উপাধিও রয়েছে। তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী Anthony Albanese, সাবেক নিউ সাউথ ওয়েলস প্রিমিয়ার Gladys Berejiklian এবং সাবেক ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া প্রিমিয়ার Mark McGowan-এর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু AFIC-এর ভেতরে এখন তার বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। সংগঠনের সাবেক সহকারী কোষাধ্যক্ষ Mohammed Berjaoui অভিযোগ করেছেন, AFIC তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

তার ভাষায়, “এটি একসময় খুব ভালো একটি সংগঠন ছিল। কিন্তু এখন এটি কার্যত একজনের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে।”

অন্যদিকে জনেইদের আইনজীবীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, বরজাউইকে সংগঠন থেকে অপসারণ করার পর থেকেই তিনি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন।

বিতর্ক আরও বেড়েছে জনেইদের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে, AFIC থেকে লাখ লাখ ডলার অনুদান গিয়েছে এমন কিছু চ্যারিটির কাছে, যেগুলো পরিচালনা করেন জনেইদের পরিবারের সদস্যরা। তবে এসব সংস্থার বাস্তব মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের স্পষ্ট প্রমাণ খুব কম পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে অন্যতম হলো “International Humanitarian Aid Inc.” এবং “Muslim Youth Support Centre Western Australia”। সমালোচকদের দাবি, অনুদানের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই।

জনেইদের আইনজীবীরা অবশ্য বলেছেন, কোনো অর্থ অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এসব সংস্থা বাস্তবেই খাদ্য সহায়তা, যুব কার্যক্রম ও কমিউনিটি প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছে।

AFIC-এর ভেতরের এই সংঘাত ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও আইনি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি, ইমেইল প্রচারণা এবং ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, যখন বরজাউই ও AFIC-এর আরেক সাবেক নেতা Keysar Trad-এর মধ্যে শারীরিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় বরজাউইয়ের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলছে।

AFIC-এর ভেতরে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো নির্বাচন নিয়ে। সংগঠনের সংবিধান অনুযায়ী সভাপতির মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফা হলেও, জনেইদ প্রায় নয় বছর ধরে সভাপতির দায়িত্বে আছেন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি চারবার নির্বাচন পিছিয়েছেন এবং নিজের প্রভাব বজায় রাখতে সময়ক্ষেপণ করছেন।

তবে তার আইনজীবীরা বলছেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই নির্বাচন বিলম্বিত হয়েছে এবং জনেইদ আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না।

সংগঠনটির বর্তমান সংকট এতটাই গভীর হয়েছে যে অস্ট্রেলিয়ার দাতব্য সংস্থা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ACNC পর্যন্ত AFIC-কে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যদি আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বার্থের সংঘাত সঠিকভাবে পরিচালনা না করা হয়, তাহলে AFIC তাদের দাতব্য মর্যাদা ও কর-সুবিধা হারাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট শুধু একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এদিকে AFIC-এর ভেতরের অনেকে আশঙ্কা করছেন, জনেইদ আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ালেও তার ঘনিষ্ঠ কেউ নেতৃত্বে এলে সংগঠনের ওপর তার প্রভাব থেকেই যাবে।

অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—AFIC কি আবার তার মূল লক্ষ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পাবে, নাকি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here