যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে হঠাৎ বড় ধরনের নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা দেওয়ায় দেশটির আর্থিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ লেবার পার্টির ভেতরে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে জনপ্রিয় বামঘেঁষা নেতা Andy Burnham খুব দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসে প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer-এর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন বলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার জেরে শুক্রবার ব্রিটিশ পাউন্ডের দর দ্রুত পড়ে যায় এবং সরকারি বন্ড বাজারেও বড় ধরনের বিক্রি শুরু হয়। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, যদি বার্নহ্যাম নেতৃত্বে আসেন তবে যুক্তরাজ্য আরও বেশি সরকারি ব্যয়, ঋণ বৃদ্ধি এবং বাজারে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপমুখী অর্থনীতির দিকে যেতে পারে।
কী ঘটেছে?
লেবার পার্টির শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্প্রতি অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পার্লামেন্টে ফেরার পথ প্রায় পরিষ্কার করে দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, জুন মাসেই একটি উপনির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেন।
যদি দলীয় মনোনয়নে বড় কোনো বাধা না আসে, তবে খুব দ্রুতই তিনি পার্লামেন্টে ফিরে এসে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়তে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবার পার্টির ভেতরে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ দ্রুত বাড়ছে। স্থানীয় নির্বাচনে হতাশাজনক ফলের পর প্রায় ৮০ জনের বেশি লেবার এমপি নাকি নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময়সূচি চেয়ে চাপ সৃষ্টি করছেন।
কেন বাজারে আতঙ্ক?
এই খবর সামনে আসতেই ব্রিটিশ অর্থবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
- ব্রিটিশ পাউন্ড দুর্বল হয়ে পড়ে
- সরকারি বন্ডের সুদ (gilt yields) ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়
- Barclays ও NatWest-এর মতো বড় ব্যাংকের শেয়ারের দাম পড়ে যায়
- FTSE 100 সূচকেও বড় চাপ তৈরি হয়
বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, বার্নহ্যামের নেতৃত্বে সরকার যদি অতিরিক্ত ব্যয়মুখী নীতি গ্রহণ করে, তাহলে যুক্তরাজ্যের বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
কেন বার্নহ্যাম এত জনপ্রিয়?
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বর্তমানে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বেশ জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত।
কোভিড সংকটসহ বিভিন্ন সময়ে তার দৃঢ় নেতৃত্ব প্রশংসা পেয়েছে। অনেকেই তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখছেন যিনি শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের আবার লেবার পার্টির দিকে টানতে পারেন।
লেবার পার্টির ভেতরে তাকে “ক্যারিশম্যাটিক ও ঐক্যবদ্ধকারী” নেতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বাজার কেন লিজ ট্রাসের সময়ের সঙ্গে তুলনা করছে?
অনেক বিশ্লেষক বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী Liz Truss-এর সময়কার আর্থিক অস্থিরতার তুলনা করছেন।
২০২২ সালে লিজ ট্রাসের কর কমানো ও ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাজারে ভয়াবহ ধস তৈরি করেছিল।
এখন বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, বার্নহ্যাম যদি বামপন্থী ব্যয়মুখী নীতি গ্রহণ করেন তবে আবারও একই ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি
বর্তমানে যুক্তরাজ্য এমনিতেই কয়েকটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি:
- ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
- উচ্চ মূল্যস্ফীতি
- বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা
- মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব
- উচ্চ সুদের হার
এই অবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বাজারে আরও চাপ তৈরি করছে।
অস্ট্রেলিয়ার জন্যও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন অস্ট্রেলিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কারণ:
- দুই দেশ CPTPP বাণিজ্য চুক্তির অংশ
- AUKUS নিরাপত্তা জোটে অংশীদার
- দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক গভীর
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতিতেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি লেবারকে “ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত” বলে সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবি তুলেছে।
সামনে কী হতে পারে?
এখন পুরো যুক্তরাজ্যের নজর জুনের সম্ভাব্য উপনির্বাচনের দিকে।
যদি অ্যান্ডি বার্নহ্যাম পার্লামেন্টে ফিরে আসেন এবং সমর্থন জোগাড় করতে পারেন, তাহলে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব বড় সংকটে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থবাজার — দুই ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।










