প্রায় তিন দশক আগে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ বিমান হামলার ঘটনা আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে। ১৯৯৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কিউবার সামরিক বাহিনী দুটি ছোট বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে, যাতে চারজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনজন ছিলেন মার্কিন নাগরিক।
এখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে কারণ সাবেক কিউবান প্রেসিডেন্ট Raúl Castro-এর বিরুদ্ধে ওই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে মামলা হতে পারে বলে জানা গেছে।
কী ঘটেছিল সেই দিন?
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে কিউবার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সময় হাজার হাজার মানুষ ভেলায় চড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।
এই মানবিক সংকটে সহায়তার জন্য গড়ে ওঠে একটি কিউবান-আমেরিকান সংগঠন — Brothers to the Rescue।
সংগঠনটির সদস্যরা ছোট সেসনা বিমান নিয়ে সমুদ্রে নিখোঁজ শরণার্থীদের খুঁজে বের করতেন এবং মার্কিন কোস্টগার্ডকে খবর দিতেন।
১৯৯৬ সালের ওই বিকেলে তিনটি ছোট বিমান ফ্লোরিডা থেকে উড্ডয়ন করে। কিন্তু মাত্র একটি বিমান ফিরে আসে।
কিউবার সামরিক বাহিনী মিগ যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে আকাশেই দুটি বিমান ধ্বংস করে দেয়।
নিহত চারজন
প্রথম বিমানে ছিলেন:
- কার্লোস কস্তা
- পাবলো মোরালেস
দ্বিতীয় বিমানে ছিলেন:
- মারিও ম্যানুয়েল দে লা পেনা
- আর্মান্দো আলেহান্দ্রে
পাবলো মোরালেস ছিলেন একসময় কিউবা থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী, যাকে আগে এই সংগঠনই উদ্ধার করেছিল। পরে তিনিও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হন।
চারজনের কারও মরদেহ কখনও উদ্ধার করা যায়নি।
আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় হামলার অভিযোগ
মানবাধিকার তদন্ত অনুযায়ী, প্রথম বিমানটি কিউবার উপকূল থেকে প্রায় ১৮ মাইল দূরে আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় গুলি করে নামানো হয়।
দ্বিতীয় বিমানটি ধ্বংস করা হয় আরও দূরে, প্রায় ৩০ মাইল দূরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিয়ম অনুযায়ী আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিউবার যুদ্ধবিমান কোনো আনুষ্ঠানিক সতর্কতা ছাড়াই সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
রেডিও বার্তায় কিউবান পাইলটদের উল্লাসও ধরা পড়ে।
এক পাইলট চিৎকার করে বলেন:
“আমরা ওদের উড়িয়ে দিয়েছি!”
রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ
ঘটনার সময় কিউবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন রাউল কাস্ত্রো।
দীর্ঘদিন ধরে কিউবান-আমেরিকান কমিউনিটি দাবি করে আসছে যে হামলার নির্দেশ উচ্চপর্যায় থেকেই দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে মায়ামির ফেডারেল প্রসিকিউটররা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সম্ভাব্য অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা
- আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন
- মাদক পাচার সংশ্লিষ্ট অভিযোগও যুক্ত হতে পারে
তবে এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়নি।
কিউবার অবস্থান কী?
কিউবার সরকার বরাবরই দাবি করে এসেছে যে সংগঠনটি মানবিক সহায়তার আড়ালে কিউবার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও “সন্ত্রাসী” কর্মকাণ্ড চালাত।
তাদের অভিযোগ, সংগঠনটি কিউবার আকাশসীমা লঙ্ঘন করত এবং রাজনৈতিক প্রচারণামূলক লিফলেট ফেলত।
তৎকালীন কিউবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী Ricardo Alarcón জাতিসংঘে বলেছিলেন,
এই বিমানগুলো “কিউবার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন” করছিল।
তবে সংগঠনটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
কিউবান নির্বাসিতদের ক্ষোভ
মায়ামিভিত্তিক কিউবান নির্বাসিত সম্প্রদায়ের কাছে এই ঘটনা এখনও গভীর ক্ষতের মতো।
হাজারো মানুষ নিহতদের স্মরণে শোকসভা করেছিল।
নিহতদের পরিবার বহু বছর ধরে বিচার দাবি করে আসছে।
নিহত কার্লোস কস্তার বোন বলেন,
“আমার ভাই বিশ্বাস করত সে একজন মার্কিন নাগরিক, আইন ভাঙছে না — তাই কেউ তাকে আঘাত করবে না।”
কেন আবার আলোচনায়?
সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য বিচার বিভাগকে চিঠি দিয়ে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তারা এমন একটি অডিও রেকর্ডিংয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন যেখানে রাউল কাস্ত্রো হামলার নির্দেশ নিয়ে আলোচনা করছেন বলে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
৩০ বছর পরও রয়ে গেছে ক্ষত
এই ঘটনা শুধু একটি সামরিক হামলা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘ বৈরী সম্পর্কের অন্যতম প্রতীক হয়ে রয়েছে।
অনেকের কাছে এটি মানবিক সহায়তার ওপর হামলা, আবার কিউবার কাছে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার পদক্ষেপ।
কিন্তু নিহতদের পরিবার ও সমর্থকদের কাছে এটি আজও “আকাশে সংঘটিত এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড।”










