Home বিশ্ব লেক চাদে আবারও জঙ্গি উত্থান: বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপি’র বিস্তারে আতঙ্কে পশ্চিম...

লেক চাদে আবারও জঙ্গি উত্থান: বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপি’র বিস্তারে আতঙ্কে পশ্চিম আফ্রিকা

28
0

পশ্চিম আফ্রিকার লেক চাদ অঞ্চলজুড়ে আবারও শক্তি বাড়াচ্ছে আইএসআইএল (আইএসআইএস)-ঘনিষ্ঠ জঙ্গিগোষ্ঠী এবং বোকো হারাম। এতে করে অঞ্চলটিতে নিরাপত্তাহীনতা, মানবিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে সতর্ক করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি পশ্চিম আফ্রিকায় সক্রিয় আইএসআইএলের শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত আবু-বিলাল আল-মিনুকির নিহত হওয়াকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে নিরাপত্তা বাহিনী। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সামরিক অভিযান চালিয়ে এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করা সম্ভব নয়, কারণ বিদ্রোহ ও জঙ্গিবাদের পেছনের মূল কারণগুলো এখনও বহাল রয়েছে।

নাইজেরিয়ার বোরনো অঙ্গরাজ্যের নাগরিক আল-মিনুকি দীর্ঘদিন ধরে লেক চাদ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিলেন। বর্তমানে আফ্রিকার সবচেয়ে সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হয়ে উঠেছে এই লেক চাদ এলাকা, যেখানে আইএসডব্লিউএপি (ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স) এবং বোকো হারাম উভয়ই শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক সেনাবাহিনী মূলত আইএসডব্লিউএপি’র আধুনিক কৌশল ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ায়, বোকো হারাম নীরবে নিজেদের নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়া ও লেক চাদকে ঘিরে থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার পরিধি আরও বেড়েছে।

লেক চাদ অববাহিকা নাইজেরিয়া, নাইজার, চাদ এবং ক্যামেরুনজুড়ে বিস্তৃত। দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গি তৎপরতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাহেল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ মরুভূমি এলাকায় সীমান্তগুলো অনেকাংশেই অরক্ষিত থাকায় জঙ্গি, অস্ত্র এবং অবৈধ পাচার নেটওয়ার্ক সহজেই চলাচল করতে পারে। বিশেষ করে মালির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর জন্য নিরাপদ করিডোর তৈরি করেছে।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সাধারণ মানুষ চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। সহিংসতার কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক এলাকায় খাদ্য সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়া, দারিদ্র্য এবং সরকারি সেবার অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, অসহায় জনগোষ্ঠী এখন জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর জোরপূর্বক নিয়োগ, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতির শিকার হচ্ছে। যেসব এলাকায় সরকারের উপস্থিতি দুর্বল, সেখানে জঙ্গিরা কখনও কখনও নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকটই এখন বিদ্রোহ টিকিয়ে রাখার অন্যতম বড় কারণ। বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপি শুধু মতাদর্শ নয়, অপহরণ, চোরাচালান, ডাকাতি, অবৈধ কর আদায় এবং মুক্তিপণ বাণিজ্যের মাধ্যমেও বিপুল অর্থ সংগ্রহ করছে। লেক চাদ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পাচার রুটগুলোর নিয়ন্ত্রণও তাদের জন্য আর্থিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া সাবেক জঙ্গিদের পুনর্বাসন কর্মসূচিগুলোও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মসংস্থান বা স্থিতিশীল জীবনের সুযোগ না পেয়ে অনেক সাবেক যোদ্ধা আবারও সশস্ত্র গোষ্ঠীতে ফিরে যাচ্ছে।

মানবিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে লেক চাদ অঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নাইজেরিয়ায়। সহিংসতার কারণে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে শিশুদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে যে, তহবিল সংকটের কারণে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ছে, অথচ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আবু-বিলাল আল-মিনুকির নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে। কারণ বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযানের পর সীমান্তবর্তী এলাকায় ছোট আকারের হামলা এবং সশস্ত্র অভিযানের সংখ্যা বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, নেতৃত্ব হারালেও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কার্যক্ষমতা এখনও অনেকটাই অটুট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও আশঙ্কা করছেন, নাইজেরিয়ার ২০২৭ সালের সাধারণ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার না হলে শুধুমাত্র সামরিক অভিযান চালিয়ে বোকো হারাম বা আইএসডব্লিউএপি’কে স্থায়ীভাবে দুর্বল করা সম্ভব হবে না। লেক চাদ অঞ্চলের সংকট এখন শুধু সন্ত্রাসবাদের নয়, বরং দারিদ্র্য, দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবিক বিপর্যয় এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here