যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ মার্কিন প্রসিকিউটররা এক ইরাকি নাগরিকের বিরুদ্ধে ইউরোপ, কানাডা এবং সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি মোহাম্মদ আল-সাদি, যাকে ইরান-সমর্থিত শক্তিশালী ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বর্ণনা করছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে উন্মুক্ত করা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আল-সাদি পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে হামলার সমন্বয় করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে আমেরিকান ও ইহুদি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পরিকল্পনাও করেছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর থেকে ইউরোপ ও কানাডায় অন্তত ২০টি অপারেশনের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল।
মার্কিন তদন্তে উঠে এসেছে, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সিনাগগ, ইহুদি প্রতিষ্ঠান এবং আমেরিকান স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্কের একটি সিনাগগে হামলার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। এছাড়া বেলজিয়ামে একটি সিনাগগে অগ্নিসংযোগ এবং প্যারিসে ব্যাংক অব আমেরিকার একটি অফিসে হামলার সঙ্গেও আল-সাদির যোগাযোগ থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানা গেছে, তুরস্কে আটক হওয়ার পর আল-সাদিকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হয়। নিউইয়র্কে আদালতে হাজির করা হলে তিনি কোনো দোষ স্বীকার করেননি। তার আইনজীবী দাবি করেন, আল-সাদিকে অপরাধী নয় বরং “রাজনৈতিক বন্দি” হিসেবে দেখা উচিত।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের হাতে ফোনালাপের রেকর্ড, ছবি এবং গোয়েন্দা নথিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, আল-সাদি লস অ্যাঞ্জেলেস, অ্যারিজোনা এবং নিউইয়র্ক সিটিতে হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আরও অভিযোগ করেছে, “হারাকাত আশাব আল-ইয়ামিন আল-ইসলামিয়া” নামে পরিচিত একটি ছোট সংগঠনের নামে যেসব হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছিল, সেগুলোর পেছনেও কাতাইব হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট গোপন নেটওয়ার্ক কাজ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াগুলো এতদিন মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কার্যক্রম চালালেও এখন তারা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়ও সক্রিয় হতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ে গবেষক অ্যারন জেলিন বলেছেন, এসব অভিযোগ ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের তথাকথিত “অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স” এখন পশ্চিমা ভূখণ্ডেও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে।
“অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স” বলতে ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি নেটওয়ার্ককে বোঝায়, যারা ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে সক্রিয় এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করে।
কাতাইব হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা, অপহরণ এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে সামরিক সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত। মার্কিন তদন্তকারীরা এমন ছবিও প্রকাশ করেছেন, যেখানে আল-সাদিকে নিহত ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির সঙ্গে দেখা গেছে।
তবে এতসব অভিযোগের পরও মামলার অনেক বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। ইরাকের কিছু সূত্র স্বীকার করেছে যে আল-সাদির ইরানি কর্মকর্তা ও মিলিশিয়া নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, যদিও কাতাইব হিজবুল্লাহর আনুষ্ঠানিক সদস্যপদের বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়।
এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র অবস্থায় রয়েছে। যদিও বর্তমানে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে, তবুও আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা খুব একটা অগ্রগতি পাচ্ছে না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের পদক্ষেপ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও নতুন চাপ তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বে ইরান-সমর্থিত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে ঘিরে নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।










