Home প্রযুক্তি স্টারলিংক কী, এর বিশেষত্ব কোথায়?

স্টারলিংক কী, এর বিশেষত্ব কোথায়?

209
0

স্টারলিংক হলো আসলে একটি স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা, যেটি অপারেট করে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন এরোস্পেস কোম্পানি স্পেসএক্স।

এই মুহূর্তে ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়া-অস্ট্রেলিয়া-আফ্রিকা জুড়ে বিশ্বের শতাধিক দেশে স্টারলিংকের পরিষেবা পাওয়া যায়।

গত বছরের জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীকে ঘিরে বিভিন্ন কনস্টেলেশনে এই কোম্পানির প্রায় হাজার সাতেক ‘লো-আর্থ অরবিট’ (এলইও) স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ আছে – যেগুলোর মাধ্যমে তারা ভূপৃষ্ঠে ইন্টারনেট পরিষেবা দিয়ে থাকে।

ইলন মাস্ক দাবি করেছেন, মহাকাশে স্টারলিংকের এই ‘মেগাকনস্টেলেশন’ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে ঢেলে সাজানো হবে এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা স্টারলিংক গ্রাহকরা তার সুবিধা পাবেন।

সাবেকি ব্রডব্যান্ড সার্ভিস যেখানে ভূগর্ভস্থ কেবল বা টাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল, স্টারলিংকের স্যাটেলাইটগুলো কিন্তু পৃথিবীর বুকে ছোট ছোট ‘ইউজার টার্মিনালে’র সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমেই ইন্টারনেট পরিষেবা দিয়ে থাকে।

যেহেতু এক্ষেত্রে টাওয়ার বসানোর বা মাটির নিচে কেবল পাতার কোনো ঝামেলা নেই, তাই দুর্গম প্রত্যন্ত প্রান্তরে বা গ্রামীণ এলাকাতেও খুব সহজে স্টারলিংকের পরিষেবা পাওয়া সম্ভব। গ্রাহকের কাছে শুধু কোম্পানির ছোট ‘ইউজার টার্মিনাল’টি থাকলেই যথেষ্ঠ।

অতি দুর্গম জায়গা থেকেও বেশ সহজে স্ট্রিমিং, ভিডিও কল, অনলাইন গেমিং বা রিমোট ওয়ার্কিং করা যায় বলেই স্টারলিংক দুনিয়া জুড়ে এত জনপ্রিয় হয়েছে।

ইউক্রেনে শিশুদের একটি খেলার পার্কে বসানো স্টারলিংকের ডিভাইস

তবে বিশ্বে স্টারলিংক বৃহত্তম স্যাটেলাইট-নির্ভর ইন্টারনেট প্রোভাইডার হলেও তারা একমাত্র নয় – ওয়ানওয়েব ইউটেলসেট, আমাজনের প্রোজেক্ট কুইপার, ভায়াস্যাট কিংবা হিউজেসনেটের মতো আরও অনেক কোম্পানিই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইন্টারনেট পরিষেবা দেয় বা দিতে চলেছে।

ইউটেলসেটে আবার ভারতীয় কোম্পানি এয়ারটেলেরও বিপুল লগ্নি আছে, যদিও তারা এদিকে ভারতে স্টারলিংকের সঙ্গেও সমঝোতার কথা ঘোষণা করেছে।

গত ১১ই মার্চ যখন এয়ারটেল স্টারলিংকের সঙ্গে তাদের অংশীদারিত্বের কথা ঘোষণা করেছিল, পর্যবেক্ষকরা সেটাকে ভারতের ডিজিটাল কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে একটা ‘ক্যু’-র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

সুনীল ভারতী মিত্তালের কোম্পানি এয়ারটেল তখন প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছিল, সারা দেশ জুড়ে তাদের যে রিটেল স্টোরের (খুচরো দোকান) বিশাল নেটওয়ার্ক আছে, সেখান থেকেই স্টারলিংক তাদের নিজস্ব ডিভাইস বিপণন ও বিতরণ করতে পারবে। এর ফলে ভারতে স্টারলিংকের প্রাথমিক বিনিয়োগও অনেক কম করতে হবে।

এই মুহূর্তে ভারতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের বাজারে সবচেয়ে বড় ‘প্লেয়ার’ হলো মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স জিও – যাদের সারা দেশে ১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি ‘কেবল-ওলা’ ইন্টারনেট গ্রাহক আছে।

এয়ারটেল-স্টারলিংকের সমঝোতার ফলে জিও যখন বিপাকে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, ঠিক তখনই মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর জিও প্ল্যাটফর্মস লিমিটেডও ঘোষণা করে তারাও স্টারলিংকের সঙ্গে অনেকটা একই ধরনের পার্টনারশিপে যাচ্ছে।

ফলে ভারতের প্রধান দুই কমিউনিকেশন জায়ান্ট – ভারতী এয়ারটেল ও রিলায়েন্স জিও – উভয় কোম্পানিই এখন ইলন মাস্কের স্টারলিংকের সঙ্গে বোঝাপড়া করে গ্রাহকদের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা দেওয়ার দিন গুনছে।

তবে এই দুটো সমঝোতাই ভারতের রেগুলেটরি অথরিটির অনুমোদন সাপেক্ষে হবে বলে জানানো হয়েছে, অর্থাৎ সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অনুমতি পাওয়ার পরই কেবল স্টারলিংক সে দেশে ব্যবসা করতে পারবে।

স্টারলিংক পরিষেবার খরচ কেমন পড়বে?

তবে যাবতীয় ভূরাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত কচকচির বাইরে গিয়ে ভারত বা বাংলাদেশের সাধারণ একজন গ্রাহক হয়তো সবার আগে জানতে চাইবেন, স্টারলিংক পরিষেবা নিতে চাইলে খরচ কত হবে? সেটা কি আদৌ আমার বাজেটের নাগালে হবে?

এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন – কারণ এই বাজারগুলোতে স্টারলিংকের ‘প্রাইস পয়েন্ট’ ঠিক কী হবে সেটা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি, আর তা ছাড়া বিশ্বের এক একটা বাজারে তাদের পরিষেবার খরচও এক এক রকম।

বিশ্বের যে একশোটিরও বেশি দেশে স্টারলিংক এখন চালু আছে, সেখানে তাদের মান্থলি সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানগুলোর খরচ ১০ ডলার থেকে শুরু করে ৫০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। আফ্রিকায় খরচ অনেক কম, ইউরোপে তুলনায় অনেক বেশি। তবে এটি আনলিমিটেড নয়।

এর সঙ্গে এককালীন খরচ দিয়ে স্টারলিংকের হার্ডওয়্যারও (ডিভাইস) গ্রাহককে কিনতে হয়, যার খরচ ২৫০ ডলার থেকে ৩৮০ ডলারের মতো পড়ে।

সেই জায়গায় তুলনা করলে দেখা যাবে ভারতের টেলিকম কোম্পানিগুলো অনেক সস্তায় ‘হোম ব্রডব্যান্ড’ প্ল্যান অফার করে থাকে, যার খরচ মাসে মাত্র ৫ ডলার (৪৫০ রুপি) বা ৭ ডলার (৬০০ রুপি) থেকে শুরু। হাইস্পিড প্রিমিয়াম প্ল্যানের খরচ অবশ্য চার বা পাঁচ হাজার রুপিও হতে পারে।

তার ওপর স্টারলিংকের ডেটা ব্যবহারে একটা ঊর্ধ্বসীমা আছে, কিন্তু ভারতে রিলায়েন্স জিও বা এয়ারটেলের বেশির ভাগ প্ল্যানই ‘আনলিমিটেড’।

ফলে ভারতের মতো একটি ‘প্রাইস-সেনসিটিভ’ বা দাম-সচেতন বাজারে সফল হতে গেলে স্টারলিংককে খুবই প্রতিযোগিতামূলক দামে প্ল্যান অফার করতে হবে। তবে এই বাজারে প্রবেশ করাটাই যদি তাদের মূল লক্ষ্য হয়, ব্যবসা বাড়ানো নয় – তাহলে অন্য কথা।

যেমন আফ্রিকার যে ১৬টি দেশে এই মুহূর্তে স্টারলিংক চালু আছে, তার মধ্যে ৫টিতেই আবার তাদের মান্থলি সাবস্ক্রিপশনের খরচ সে দেশের প্রধান ফিক্সড ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের তুলনায় কম।

হিমালয়ের কোলে ভুটানে স্টারলিংক সদ্যই পরিষেবা চালু করেছে – সেখানে আবার রয়েছে তাদের দুটি প্ল্যান।

‘রেসিডেনশিয়াল লাইট’ প্ল্যানের খরচ মাসে ৩০০০ ন্যু (৩০০০ রুপি), কিন্তু তাতে অফুরন্ত ডেটা ব্যবহারের সুযোগ নেই। ‘স্ট্যান্ডার্ড’ প্ল্যান নিলে আবার মাসে ৪২০০ ন্যু (৪২০০ রুপি) দিয়েই গ্রাহক আনলিমিটেড ইউসেজ পাবেন।

সোজা কথায়, দামের ক্ষেত্রে স্টারলিংক একেক দেশে পরিস্থিতি অনুযায়ী একেক ধরনের মডেল ব্যবহার করে থাকে।

ভারতে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এদেশে স্টারলিংকের খরচ প্রতিষ্ঠিত টেলিকম জায়ান্টদের তুলনায় অনেকটাই বেশি হবে, এর ডেটা স্পিডও কম থাকবে।

অন্যভাবে বললে, এ দেশের দুর্গম ও ‘আন্ডারসার্ভড’ (যেখানে কেবল বা টাওয়ার নেই) এলাকাগুলোতে পৌঁছানোই হবে স্টারলিংকের প্রধান লক্ষ্য – জিও বা এয়ারটেলের ব্রডব্যান্ড সার্ভিসকে তারা সেভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here