Home বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সংবাদমাধ্যমে: নতুন সম্ভাবনা নাকি চিন্তার বিষয়?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সংবাদমাধ্যমে: নতুন সম্ভাবনা নাকি চিন্তার বিষয়?

174
0

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সংবাদমাধ্যমে: নতুন সম্ভাবনা নাকি চিন্তার বিষয়?

সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ কি মানুষের হাতে থাকবে, নাকি প্রযুক্তির? এটি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আর শুধু গবেষণার বিষয় নয়, বাস্তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমে।

এআই প্রযুক্তি এখন সংবাদ তৈরির, সম্পাদনা করার, উপস্থাপন এবং পাঠকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতার ধরন বদলে দিচ্ছে এই প্রযুক্তি। স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিবেদন তৈরি করা, ভিডিওতে ভয়েসওভার যোগ করা, এবং ভিডিও ফরম্যাটে সংবাদ পরিবেশন—এ সবই এখন অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্ভব। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, ব্লুমবার্গসহ অনেক খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে রিপোর্টিংয়ের গতি বাড়িয়েছে।

সম্প্রতি ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনি, বা ভিইও থ্রির মতো টুলগুলো দিয়ে সহজে খসড়া লেখা, অনুবাদ, সারাংশ তৈরি এবং প্রাথমিক স্ক্রিপ্ট লেখা হচ্ছে। একইভাবে রানওয়ে বা পিকাল্যাবসের মতো ভিডিও টুলগুলো দিয়ে মাল্টি-ল্যাঙ্গুয়েজ ভিডিও, ভিজ্যুয়াল রিপোর্ট এবং ভয়েসওভারযুক্ত সংবাদ বুলেটিন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এই ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ভবিষ্যতের সংবাদ উপস্থাপনায় নতুন ধারার সূচনা করছে।

বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিকতায়ও এআই-এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এআই এখন বিশাল তথ্যভান্ডার মুহূর্তেই বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে সহায়তা করছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন ভাষার সাক্ষাৎকারের অনুবাদ করে এখন আরও দ্রুত ও নির্ভুল প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। বিবিসি এবং বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যমও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরিতে।

এআই শুধু প্রতিবেদন তৈরি করেই থেমে থাকছে না, এটি পাঠকদের কাছে কোন খবর পৌঁছাবে তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গুগল নিউজ এবং ফেসবুকের অ্যালগরিদম ইতোমধ্যেই খবরের র‍্যাঙ্কিং নির্ধারণ করছে। অনেক সংবাদপোর্টালও এআই-ভিত্তিক রিকমেন্ডেশন সিস্টেম চালু করেছে, যা পাঠক কী পড়ছে, কতক্ষণ থাকছে এবং কোন ধরনের প্রতিবেদন তাদের আগ্রহের তা বিশ্লেষণ করে।

যদিও এআই প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৃদ্ধি সাংবাদিকতার জন্য একদিকে সুবিধা বয়ে আনলেও, এর সঙ্গে কিছু নৈতিক ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা সমস্যা যুক্ত। বিশেষত, এআই অনেক সময় ভুল তথ্য উপস্থাপন করতে পারে এবং বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন তৈরি হতে পারে, যা সাংবাদিকদের জন্য সতর্কতা বাড়িয়ে দেয়।

এখানে একটি বড় প্রশ্ন ওঠে: যদি এআই ভুল তথ্য উপস্থাপন করে, তাহলে এর দায় কার? লেখক, সংবাদমাধ্যম, না প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান? যদিও এখনো স্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেমন পয়েন্টার ইনস্টিটিউট এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস কিছু নীতিমালা প্রস্তাব করেছে।

এআইয়ে পক্ষপাতমূলক কনটেন্ট তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে, কারণ এটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে, যেখানে অনেক সময় জাতিগত বা ভাষাগত পক্ষপাত থাকতে পারে। ফলে, সংবাদে একপাক্ষিক তথ্য প্রদর্শন হতে পারে এবং ভিন্নমতের তথ্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে।

এআই পুরোপুরি সাংবাদিকতার কাজ করতে পারবে না, তবে এটি সাংবাদিকদের কাজে সহায়তা করতে পারে। সাংবাদিকদের কাজ হবে গবেষণা, অনুসন্ধান এবং গল্প বলার কাজ করা, আর এআই তাদের এসব কাজ সহজ করতে সহায়তা করবে। এই কারণেই অনেক সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যেই সাংবাদিকদের জন্য এআই প্রশিক্ষণ চালু করেছে, যাতে তারা ভবিষ্যতের সংবাদমাধ্যমে পিছিয়ে না পড়ে।

বিশ্বে এখন নানা দেশে এআই ব্যবহারের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এআই অ্যাক্ট’। সংবাদমাধ্যমও এই প্রযুক্তির প্রয়োগে নৈতিকতা বজায় রাখতে নতুন পন্থা গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশেও সংবাদমাধ্যমে এআই ব্যবহারের হার বাড়ছে। যদিও এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কয়েকটি গণমাধ্যম এখন ভিডিও স্ক্রিপ্ট লেখা, ভয়েসওভার তৈরি এবং সোশ্যাল মিডিয়া থাম্বনেইল ডিজাইনে এআই ব্যবহার করছে।

তবে, সবশেষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতার অস্তিত্বকে সংকটে ফেলতে পারবে না। কারণ, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি দায়িত্ব, মানবিকতা এবং সত্যের অনুসন্ধান। এই যাত্রায় এআই হবে সহায়ক, কিন্তু চালক নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here