বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এখন পুরো খাতকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনিয়ম, দুর্বল নজরদারি, সুবিধাভোগীদের ঋণ লোপাট—সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা পেরিয়ে যেকোনো সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
সর্বশেষ বিবরণ অনুযায়ী, এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা, আর মাত্র তিন মাসে বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। বছরে বৃদ্ধি ১২৬.১৬ শতাংশ—যা নজিরবিহীন। সব মিলিয়ে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বুধবার প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
খেলাপি বৃদ্ধির ভয়ংকর চিত্র
- ২০২4 সালের সেপ্টেম্বর: খেলাপি ঋণ ২.৮৪ লাখ কোটি টাকা
- ২০২5 সালের সেপ্টেম্বর: খেলাপি ঋণ ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা
➡️ এক বছরের বৃদ্ধি: ৩.৬০ লাখ কোটি টাকা - ২০২5 সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬.০৮ লাখ কোটি টাকা
➡️ তিন মাসে বৃদ্ধি: ৩৬,১৭০ কোটি টাকা
মোট বিতরণকৃত ঋণ সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।
কেন এত খেলাপি প্রকাশ পাচ্ছে?
ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে প্রয়োগ করায় অনেক ‘গোপন’ খেলাপি এখন প্রকৃত শ্রেণিতে ফিরছে।
আগে যেসব ঋণ কাগজে ‘চলতি’ হিসেবে দেখানো হতো, সেগুলোর প্রকৃত চিত্র এখন স্পষ্ট হচ্ছে।
ফলে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের ঝুঁকিপূর্ণ ও অনাদায়ি ঋণগুলো একে একে প্রকাশ পাচ্ছে।
রাজনৈতিক লুটপাটের প্রভাব
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া হয়েছিল—এখন তার বড় অংশ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
ফলে চলতি বছরের হিসাবেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সবচেয়ে ঝুঁকিতে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার এখন প্রায় ৫০ শতাংশ।
আইএমএফের কঠোর শর্ত
ডলার সংকটে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ নিতে গিয়ে বাংলাদেশকে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম—
- ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কমিয়ে ৫%
- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ১০%
বর্তমান অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগ
বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন—
“ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ৩৬ শতাংশ। যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, হার ৪০ শতাংশেও পৌঁছে যেতে পারে—যা ব্যাংক খাতের জন্য ভয়াবহ সংকেত।”
তিনি আরও বলেন—
- প্রকৃত চিত্র দৃশ্যমান হওয়া ইতিবাচক
- তবে তা সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করছে
- ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দরকার
- অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রে নীতিগত সমাধান দিতে হবে
- লুটপাটে জড়িত ব্যক্তি বা কর্মকর্তা—সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে










