বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব অর্থনীতির সব খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে একের পর এক আন্দোলন, অসন্তোষ, দাবি–দাওয়া এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতির কারণে সার্বিক আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ থমকে গেছে, উৎপাদন কমেছে, মানুষের আয় সংকুচিত হয়েছে এবং ব্যবসায় লাভের বদলে এখন টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে। অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বিপুল শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এই সংকটের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয়ে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২২০ কোটি টাকা। আয়কর দাখিলকারীদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ কোনো কর দিতে পারেননি বা শূন্য রিটার্ন জমা দিয়েছেন। আগের করবর্ষে ৪৫ লাখ মানুষ কর দিলেও এবার সেই সংখ্যা অনেক কম। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাকরি হারানো এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া বড় করদাতাদের প্রভাব আয়করে বড় ঘাটতি তৈরি করেছে। ভ্যাট আদায়েও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ায় ভ্যাট বাড়ার কথা থাকলেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং ভোগ কমে যাওয়ায় আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত ভ্যাট আদায় ছিল ৪৬ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১,২৬৩ কোটি কম। আমদানিও কমে গেছে, ফলে আমদানি শুল্ক থেকে আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। জুলাই–অক্টোবর সময়ে আমদানি খাতে ঘাটতি হয়েছে ৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
এই মন্থরতার আরেকটি দিক হলো বছরের প্রথম চার মাসে এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৮.৩৩ শতাংশ, যা প্রকল্প বন্ধ, ব্যয় সংকোচন ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব বহন করছে। আমদানি কমে যাওয়ায় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, কর্মসংস্থান কমছে এবং বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হচ্ছে। রিজার্ভ বাড়া আপাতভাবে ভালো মনে হলেও বাস্তবে এটি আমদানি কমে যাওয়ার ইঙ্গিত, যা চাহিদাহীনতা ও উৎপাদন সংকোচনের প্রতিফলন।
অর্থনীতির সামগ্রিক ধীরগতির কারণে প্রবৃদ্ধিও কমছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের নিচে, যা আগের বছরের ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির তুলনায় স্পষ্ট পতন। বিশ্বব্যাংক মনে করছে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৪.৮ শতাংশ হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরও ঋণ নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, আর ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্যতা কমে যাবে, যা বিনিয়োগকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এতে রাজস্ব ঘাটতি সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য চলকের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
বাণিজ্য ও শিল্প খাতের নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। বিনিয়োগ নেই, উৎপাদন কমছে, ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে, মানুষের আয় কমায় ভোগব্যয়ও হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে কর, ভ্যাট ও শুল্ক আদায় কমছে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার না আসা পর্যন্ত অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে না। তারা বলছেন, ব্যবসা সক্রিয় হলে রাজস্ব সংগ্রহও স্বাভাবিক হবে। বড় শিল্প মালিকরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না—যেমন বিজিএমইএ সভাপতি চার মাস ধরে বৈঠকের সময় না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। পোশাক, টেক্সটাইলসহ উৎপাদনমুখী খাতগুলো নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতিকে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলছেন, অর্থনৈতিক নীতি কাঠামোতে সুস্পষ্টতা না এলে ব্যবসা, বিনিয়োগ, আমদানি ও রপ্তানি—কোনো ক্ষেত্রেই উন্নতি আসবে না। ফলে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ আরও বেড়ে দেশে ঋণচক্রের ঝুঁকি বাড়তে পারে।










