Home এশিয়া পেসিফিক সিডনির বন্দুক হামলা: মানবতা বনাম ঘৃণার রাজনীতি

সিডনির বন্দুক হামলা: মানবতা বনাম ঘৃণার রাজনীতি

157
0

১৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডাই সমুদ্রসৈকতে সংঘটিত বন্দুক হামলা শুধু দেশটির গত তিন দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতাই নয়—এটি ছিল বিশ্বমানবতার অন্তরে এক নির্মম আঘাত। হানুক্কার প্রথম সন্ধ্যায়, যখন হাজারের বেশি মানুষ উৎসবে মগ্ন ছিলেন, তখন দুই বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে প্রাণ হারায় অন্তত ১৫ জন। পুরো শহর শোকাচ্ছন্ন। তবে ঘটনার পরের প্রতিক্রিয়ায় যা আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, তা হলো—এই ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘তকমা লাগানোর’ রাজনীতি।

প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ যখন শান্তি ও সংহতির ডাক দিচ্ছেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত বিভাজনমূলক বয়ান ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ এই হামলাকে ইসলামবিদ্বেষের ইন্ধন হিসেবে ব্যবহার করছে, আবার কেউ একে ইহুদিবিদ্বেষের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরছে। অথচ সব ধরনের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে সত্যটি স্পষ্ট, তা হলো—মানুষের পরিচয় তার মানবিকতায়, ধর্ম বা গাত্রবর্ণে নয়।

এই বিভ্রান্তিময় রাজনীতির ঠিক মাঝে উঠে এসেছেন ৪৩ বছর বয়সী সিরীয় অভিবাসী আহমেদ আল আহমেদ। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে একজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে বাধা দিয়েছেন। তাঁর হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল সাহস। যিনি এক দশক আগে সিরিয়ায় সন্ত্রাস থেকে পালিয়ে সিডনিতে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিলেন, তিনিই আজ সন্ত্রাস রুখে দিয়েছেন।

এই ঘটনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—যদি হামলাকারী মুসলিম হয়ে থাকেন, তবে যিনি সেই হামলা থামিয়ে অসংখ্য জীবন বাঁচিয়েছেন, তিনিও একজন মুসলমান। তবু সমাজ এখনো মানুষকে দ্বিমাত্রিক চোখে দেখে—হয় “ভালো” নয় “খারাপ”, “আমরা” নয় “তারা”। আহমেদের বীরত্ব এই ঘৃণানির্ভর গাঁটছড়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

আহমেদ আল আহমেদের পদক্ষেপ ছিল তাৎক্ষণিক, বাস্তব এবং মানবিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁর এই বীরত্বকে অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কারণ এটি প্রতিষ্ঠিত মুসলিমবিরোধী বয়ানের সঙ্গে খাপ খায় না। তাঁর গল্প আমাদের শেখায়, ভালো-খারাপ মানুষের ভেদ ধর্ম দিয়ে হয় না; হয় আচরণ দিয়ে।

এদিকে, ঘটনাটিকে ঘিরে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মতো নেতারা এটিকে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষের ফল বলে প্রচার করেছেন। অপরদিকে, সামাজিক মাধ্যমে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ফেরিওয়ালারা একে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা সাজানো নাটক বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত। এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই একটি ভয়াবহ বাস্তবতাকে বিকৃত করছে।

এই হামলার পর অভিবাসী, বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় বা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষদের প্রতি বৈরী মনোভাব আরও তীব্র হবে, তা অনিবার্য বলেই মনে হয়। ভিসা পাওয়া, চাকরি পাওয়া বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার মতো বহুত্ববাদী সমাজ যদি এখন ধর্ম বা জাতিসত্তার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করতে শুরু করে, তবে তা হবে এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিক্রিয়া।

আমরা কি শুধুই খুঁজব ঘাতকের ধর্মীয় পরিচয়? না কি দেখব কে তাকে রুখে দিয়েছিল? আহমেদের শরীরে গুলির ক্ষত সমাজের ঘৃণার দাগ মুছে দেওয়ার একটি সুযোগ। এই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী আলবানিজের উচিত আহমেদের মতো মানুষের সাহসিকতাকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরা, যাতে মানবতার বার্তাটি ঘৃণার চেয়ে দ্রুত ছড়ায়।

সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম নেই। এটি মানবতার শত্রু। যারা এই রক্তপাতকে নিজেদের ঘৃণা পূরণের হাতিয়ার বানাতে চায়, তাদের পরাজিত করাও জরুরি।

আহমেদ আল আহমেদ আমাদের শিখিয়েছেন—মানবতা রক্ষার পথ কখনো বিভাজনের মধ্য দিয়ে যায় না। আমাদের এখন প্রয়োজন তাঁর দেখানো পথে হাঁটা, যাতে ঘৃণা নয়, শান্তি ও সহমর্মিতা হয় আমাদের প্রধান পরিচয়। আর না হলে, সন্ত্রাসবাদ শুধু রক্তপাত নয়, মানবিকতা ও সভ্যতারও পরাজয় ঘটাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here