Home বিশ্ব কার্টেল-নিয়ন্ত্রিত স্বর্ণ কি ঢুকে পড়েছিল সরকারি বাজারে? রয়্যাল কানাডিয়ান মিন্ট ঘিরে বিস্ফোরক...

কার্টেল-নিয়ন্ত্রিত স্বর্ণ কি ঢুকে পড়েছিল সরকারি বাজারে? রয়্যাল কানাডিয়ান মিন্ট ঘিরে বিস্ফোরক তদন্ত

28
0

বিশ্বব্যাপী স্বর্ণ বাণিজ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন উঠেছে এক বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, কলম্বিয়ার সংগঠিত অপরাধচক্র-নিয়ন্ত্রিত অবৈধ খনি থেকে আসা স্বর্ণ শেষ পর্যন্ত Royal Canadian Mint-এর সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল।

এই অনুসন্ধান পরিচালনা করেন Justin Scheck, যিনি The New York Times-এর হয়ে দীর্ঘ তদন্তের মাধ্যমে স্বর্ণের আন্তর্জাতিক যাত্রাপথ অনুসরণ করেন।

তদন্তে দেখা যায়, কলম্বিয়ার কার্টেল-নিয়ন্ত্রিত খনি এলাকা থেকে স্বর্ণ আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উত্তর আমেরিকার সরকারি স্বর্ণবাজার পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তের শুরু হয়েছিল United States Mint-এর বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি স্বর্ণমুদ্রার উৎস অনুসন্ধান দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এসব মুদ্রা শুধুমাত্র দেশীয়ভাবে উত্তোলিত স্বর্ণ ব্যবহার করে তৈরি হওয়ার কথা।

তদন্তকারীরা পরে জানতে পারেন, U.S. Mint-এর সঙ্গে যুক্ত স্বর্ণ সরবরাহকারীদের মধ্যে ছিল Royal Canadian Mint।

প্রশ্নের মুখে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, তাদের পরিশোধিত স্বর্ণ উত্তর আমেরিকান উৎস থেকেই এসেছে।

কিন্তু পরবর্তী অনুসন্ধানে উঠে আসে নতুন তথ্য।

একটি Texas-based precious metals dealer দক্ষিণ আমেরিকা থেকে স্বর্ণ আমদানি করে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত স্বর্ণের সঙ্গে মিশিয়ে পরে কানাডায় পরিশোধনের জন্য পাঠাত।

এই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা দক্ষিণ আমেরিকান স্বর্ণের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে পৌঁছে যান Colombia-এর খনি অঞ্চলে।

তদন্তে অভিযোগ করা হয়, ওই স্বর্ণের একটি অংশ আসে Clan del Golfo নামের শক্তিশালী মাদক পাচারকারী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে।

সাংবাদিকরা কলম্বিয়ার Caucasia এলাকার দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে অবৈধ খনির কার্যক্রমের চিত্র ধারণ করেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, খনি শ্রমিকদের ওই অপরাধচক্রকে অর্থ দিতে হতো খনিতে প্রবেশ ও নিরাপত্তা পাওয়ার বিনিময়ে।

তদন্তে খনির কঠিন ও বিপজ্জনক পরিবেশের বর্ণনাও উঠে আসে।

ভারী যন্ত্রপাতি, ডিজেল পাম্প ও উচ্চচাপের পাইপ ব্যবহার করে মাটি কেটে স্বর্ণ উত্তোলন করা হচ্ছিল।

এছাড়া সেখানে পারদ ব্যবহারের প্রমাণও পাওয়া যায়, যদিও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কারণে কলম্বিয়ায় এই রাসায়নিকের ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ।

তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল—কীভাবে অবৈধ স্বর্ণ কাগজে-কলমে “বৈধ” হয়ে উঠছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলম্বিয়ার কর্তৃপক্ষ মূলত অনুমতিপত্রের ওপর নির্ভর করছিল, সরাসরি খনির প্রকৃত উৎস যাচাই করছিল না।

অনেক ছোট আকারের খনির লাইসেন্স আইনিভাবে সীমিত পরিমাণ হাতে খনন করা স্বর্ণ উত্তোলনের অনুমতি দিলেও, অভিযোগ উঠেছে যে বড় অবৈধ খনির স্বর্ণও সেই লাইসেন্সের আওতায় দেখানো হতো।

একবার সরকারি ডাটাবেজে নিবন্ধিত হয়ে গেলে সেই স্বর্ণ আন্তর্জাতিক রপ্তানিকারক ও ক্রেতাদের কাছে বৈধ হিসেবে বিবেচিত হতো।

তদন্তে আরও দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় পৌঁছানোর পর সেই স্বর্ণ কাগজে-কলমে “বৈধ উত্তর আমেরিকান স্বর্ণে” রূপান্তরিত হয়ে যেত, যদিও এর প্রকৃত উৎস ছিল কার্টেল-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।

Royal Canadian Mint নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেছে, কলম্বিয়ান স্বর্ণকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের সঙ্গে মেশানোর পর তা প্রযুক্তিগতভাবে “North American material” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

তবে তদন্ত প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ভবিষ্যতে তারা স্বর্ণের উৎস দেশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে।

এছাড়া অভিযোগে জড়িত টেক্সাসভিত্তিক সরবরাহকারীও নাকি সংশ্লিষ্ট কলম্বিয়ান রপ্তানিকারকের কাছ থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ বন্ধ করেছে।

এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী মূল্যবান ধাতু শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে আসা স্বর্ণের ক্ষেত্রে বড় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কঠোর যাচাই-বাছাই করা উচিত ছিল।

সমালোচকদের অভিযোগ, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় দায়িত্ব এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—ফলে প্রকৃত উৎস যাচাইয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত কেউই পুরোপুরি দায় নিচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, যদি আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে আরও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু না হয়, তাহলে সংগঠিত অপরাধচক্র ভবিষ্যতেও অবৈধ সম্পদ বৈধ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় ঢুকিয়ে দিতে পারবে।

এই তদন্ত আবারও প্রমাণ করেছে, আধুনিক বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে খনি থেকে আর্থিক বাজার পর্যন্ত একটি পণ্যের প্রকৃত উৎস অনুসরণ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here