আইনের শাসন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি। তবে যখন আইনের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিচারব্যবস্থা শুধু ক্ষমতাবানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়, তখন সমাজে জন্ম নেয় একটি অপ্রতিরোধ্য দানব—গণবিচার বা ‘মব জাস্টিস’। সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বন তাঁর ‘The Crowd: A Study of the Popular Mind’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, উন্মত্ত জনতা বিচারবোধ হারিয়ে ফেলে এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতা জন-উন্মাদনার মাঝে বিলীন হয়ে যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ‘মবিউক্রেসি’ ক্রমেই ভয়ানক রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর একদিকে ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটলেও, অন্যদিকে রাজপথে আইনের অনুপস্থিতি ভয়াবহ গণপিটুনিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। এটি শুধুই অপরাধ দমনের একটি বিকৃত রূপ নয়, বরং রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ।
‘মব জাস্টিস’ শব্দটির ঐতিহাসিক উৎস ভিন্নমত থাকলেও, সবচেয়ে স্বীকৃত তথ্য অনুযায়ী এটি এসেছে মার্কিন গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী ভার্জিনিয়ার কর্নেল চার্লস লিঞ্চের নাম থেকে। আইনবহির্ভূত বিচারের এই প্রক্রিয়া ইতিহাসে একাধিকবার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে—যেমন আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গদের বর্বরতা কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি। যখন রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া জনগণের আস্থাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখনই জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়।
বাংলাদেশে গণপিটুনির ইতিহাস গত তিন দশকে অনেক বদলেছে। নব্বই দশকে ছিনতাইকারী সন্দেহে sporadic ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ২০১১ সালের আমিনবাজারে ৬ ছাত্রের নির্মম হত্যাকাণ্ড বা ২০১৯ সালে বাড্ডায় রেনুর মৃত্যু ছিল দেশের সামাজিক বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো ঘটনা। তবে ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে গণবিচার শুধু অপরাধ দমনে নয়, বরং রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান বা মতাদর্শিক ‘শত্রু নিধনের’ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
এ অবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডার্কহেইমের ‘Anomie’ তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক। তার মতে, বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লবের পর যখন পুরনো সামাজিক নিয়ম নষ্ট হয়ে যায় এবং নতুন কোনো আইনি কাঠামো দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায় না, তখন সমাজে অনিয়ম ও নৈরাজ্যের জন্ম হয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ফ্যাসিস্ট কাঠামোর পতনের মাঝখানে সাধারণ মানুষ এক ধরণের আইনি শূন্যতা অনুভব করছে, যা জনগণকে ‘আইন হাতে তুলে নিতে’ উৎসাহিত করছে।
মব জাস্টিসের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার মধ্য দিয়ে। বিটিআরসি, বিটিভি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কিংবা সেতু ভবনের ওপর যে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তা দেশের আইটি ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে অচল করে দিয়েছিল। যদিও গ্রেপ্তার হয়েছে অনেকে, তবুও এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন তার নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও দুরূহ হয়ে পড়ে।
গবেষণা বলছে, তিনটি মানসিক প্রবণতা মব জাস্টিসে ইন্ধন দেয়—গণপরিসরে পরিচয়হীনতা, দায়িত্ব ভাগাভাগি করার মানসিকতা, এবং তৎক্ষণাৎ বিচার দেখে স্বস্তি পাওয়ার প্রবণতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবঘুরে তোফাজ্জলকে মারধর করা কিংবা খাগড়াছড়িতে শিক্ষক সোহেল রানাকে হত্যা—এগুলো বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতারই ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের ‘রুল অব ল’ সূচকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিচের দিকে অবস্থান করছে, বিশেষ করে শৃঙ্খলা ও অপরাধবিচার ব্যবস্থা সংক্রান্ত স্কোরে। এ প্রবণতা চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডগলাস নর্থ বলেছেন, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উৎস হয় কেবল সহিংসতা, সেখানে উন্নয়ন কখনও টেকসই হতে পারে না।
মব জাস্টিস ঠেকাতে বর্তমানে বাংলাদেশে কোনও বিশেষ আইন নেই। দণ্ডবিধির ১৪১–১৪৯ ধারা ব্যবহার করে এর বিচার করা হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ মামলায় অজ্ঞাতনামা ৫০০/১০০০ জন উল্লেখ করায় প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়ার ফলে তারা অনেকে মাঠপর্যায়ে হস্তক্ষেপ করতেও ভয় পায়। বিশেষত যারা রাজনৈতিক ‘ছাত্র’ বা ‘বিপ্লবী’ পরিচয় বহন করে, তারা প্রায়শই পার পেয়ে যায়।
পূর্ববর্তী সরকার আমলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছিল ভয়ংকর ও দমনমূলক; আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই জায়গা দখল করেছে উন্মত্ত জনতা। এই পরিবর্তন কাঠামোগত হলেও ফলাফল একই—নাগরিক নিরাপত্তার অবলুপ্তি। এখন যদি নতুন সরকার সুশাসন নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে নিষ্ক্রিয়তা বা দমননীতি কোনোটাই সমাধান নয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে নিচের পাঁচটি পদক্ষেপ নিতে হবে—
১. মব জাস্টিস দমনে একটি আলাদা আইন প্রণয়ন।
২. নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, বিশেষ করে তোফাজ্জল বা সোহেল রানার মতো ঘটনার।
৩. ডিজিটাল মাধ্যমে গুজব শনাক্ত করতে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সেল গঠন।
৪. পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন এবং নিষ্ক্রিয়তা রোধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৫. স্থানীয়ভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যেখানে ছাত্র, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতারা সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন।
এভাবে রাষ্ট্র যদি কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ না করে, তবে মব জাস্টিস কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং তা এক সময় গণতন্ত্রের জন্য চূড়ান্ত হুমকিতে পরিণত হবে।










