Home বিশ্ব যুদ্ধের ক্লান্তি ও অর্থনৈতিক চাপে ম্লান রাশিয়ার বিজয় দিবস উদযাপন

যুদ্ধের ক্লান্তি ও অর্থনৈতিক চাপে ম্লান রাশিয়ার বিজয় দিবস উদযাপন

22
0

রাশিয়ার ঐতিহাসিক বিজয় দিবস উদযাপন এবারও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও এর আড়ালে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যুদ্ধ ক্লান্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ। ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশজুড়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, যা এবারকার বিজয় দিবসের আবহকেও অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও মস্কোর রাস্তাঘাট রুশ পতাকা, সামরিক ব্যানার, ফুল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ‘সেন্ট জর্জ’ ফিতায় সাজানো হয়েছে। মে মাসের শুরু থেকে ৯ মে পর্যন্ত ছুটির এই সময়টি ঐতিহ্যগতভাবে রাশিয়ায় জাতীয় গৌরব ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বাহ্যিক দেশাত্মবোধক পরিবেশের আড়ালে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ কর, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সংকট মানুষের মনোবলকে দুর্বল করে তুলেছে।

রাজধানী মস্কোতে রেড স্কয়ারের সামরিক কুচকাওয়াজকে ঘিরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। বিভিন্ন পার্ক ও জনসমাগমস্থলে বসানো হয়েছে মেটাল ডিটেক্টর, মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় কিছু উৎসবের আয়োজনও সীমিত করা হয়েছে।

সম্প্রতি মস্কোর কাছাকাছি একটি আবাসিক ভবনে ড্রোন হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, রাজধানীমুখী একাধিক ড্রোন মাঝপথেই ভূপাতিত করা হয়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইউক্রেনের সামরিক হামলার সক্ষমতা এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরেও পৌঁছে গেছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজয় দিবস উপলক্ষে সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য ক্রেমলিন ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা চালানোর চেষ্টা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সম্ভাব্য “সন্ত্রাসী হুমকি”র কথা উল্লেখ করে সরকার সামরিক কুচকাওয়াজে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকারও সীমিত করেছে।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার তেল স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সীমান্ত থেকে অনেক দূরের অঞ্চলগুলোতেও হামলার ঘটনা ঘটছে, যা যুদ্ধের প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখন অনেক রুশ নাগরিক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের সময়সীমার চেয়েও বেশি দীর্ঘ হয়ে গেছে ইউক্রেন যুদ্ধ। এতে মানুষের জীবনে বেড়েছে অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা।

স্বাধীন জরিপগুলো বলছে, গত এক বছরে জনগণের উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin-এর জনপ্রিয়তাও যুদ্ধ শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, শ্রমিক সংকট এবং ব্যবসায়িক আস্থার দুর্বলতার মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এমনকি সরকারপন্থী কিছু বিশ্লেষকও সতর্ক করেছেন যে দেশটি ধীরে ধীরে স্থবিরতা ও জীবনমানের অবনতির দিকে এগোচ্ছে।

একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন কঠোর নিয়ন্ত্রণও আরও বাড়িয়েছে ক্রেমলিন। স্বাধীন গণমাধ্যম, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে নতুন সেন্সরশিপ আইন কার্যকর করা হচ্ছে।

তবে এখনও অনেক রুশ নাগরিক সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করছেন। তাদের মতে, এটি পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও যুদ্ধকালীন বিধিনিষেধ প্রয়োজন।

তবুও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের কাছে এবারের বিজয় দিবস আনন্দের চেয়ে অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে, কারণ যুদ্ধের বাস্তবতা এখন রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here