ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যশোর–৪ আসনে প্রতিনিয়ত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন বিএনপির প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজী (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক গোলাম রসুল (দাঁড়িপাল্লা)। মোট সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বাকিরা প্রচারণায় তেমন সক্রিয় নন, ফলে ভোটের মাঠ কার্যত দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে তিনধরনের ভোটার
স্থানীয়দের মতে, এই আসনে তিন ধরনের ভোটারই ফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন—
১️⃣ সংখ্যালঘু ভোটার
২️⃣ শ্রমজীবী ও শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক ভোটার
৩️⃣ আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক
এ আসনে মোট ভোটার প্রায় ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৪ জন, যার মধ্যে ৭০ হাজারের বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত।
শিল্পনগরী নওয়াপাড়া ও আশপাশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। কৃষিভিত্তিক জনসংখ্যাও বড় অংশ জুড়ে আছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য—এ তিনটি ভোটব্যাংকের বড় অংশ যিনি আকর্ষণ করতে পারবেন, তাঁরই জয়ের পথ সুগম হয়ে যাবে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণ এখনও নিশ্চিত নয়
২০১৪ সালের নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া এই আসনের সংখ্যালঘুদের মধ্যে এখনও ভোটে যাওয়া–না–যাওয়া নিয়ে দ্বিধা রয়েছে। তাঁদের অনেকে ‘শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত’ বা নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
রাজনৈতিক সমীকরণ
ঐতিহ্যগতভাবে এই আসন BNP ও Awami League–কেন্দ্রিক। তবে গত কয়েক বছরে জামায়াতে ইসলামীও এখানে ভোট ও সাংগঠনিক অবস্থান কিছুটা শক্ত করেছে। যদিও সরাসরি লড়াইয়ের মতো শক্তিশালী কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন—
- স্বতন্ত্র: এম. নাজিম উদ্দিন আল আজাদ
- জাতীয় পার্টি: জহুরুল হক
- মাইনরিটি জনতা পার্টি: সুকৃতি কুমার মণ্ডল
- ইসলামী আন্দোলন: বায়েজীদ হোসাইন
- খেলাফত মজলিস: আশেক এলাহী
দুই উপজেলার ভিন্ন আর্থসামাজিক চিত্র
যশোর–৪ আসনটি গঠিত বাঘারপাড়া, অভয়নগর ও সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়ন নিয়ে।
- বাঘারপাড়া: সবজি ও কৃষিপণ্য উৎপাদনে পরিচিত; শিল্পকারখানা না থাকায় কর্মসংস্থান সংকট।
- অভয়নগর: শিল্প ও নৌবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি। নওয়াপাড়া নৌবন্দরে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম খুবই ব্যস্ত। তবে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেকারত্ব বাড়ছে।
একজন স্থানীয় ভোটার বলেন,
“উন্নয়ন প্রয়োজন, তবে তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরাপত্তা। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের জীবন–সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা জরুরি।”
ভোটের মাঠে দলগুলোর শক্তি–দুর্বলতা
- বসুন্দিয়া, বাসুয়াড়ি, শুভরাড়া ও পায়রা এলাকায় জামায়াতের ভোট তুলনামূলক বেশি।
- দুই উপজেলাতেই মোট ভোটসংখ্যায় বিএনপি এগিয়ে।
বিএনপির ভরসা কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব—তিনি এলাকাব্যাপী অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে ব্যাংকসংক্রান্ত জটিলতায় মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় এবার দলের প্রার্থী হয়েছেন অভয়নগর উপজেলা সভাপতি মতিয়ার রহমান ফারাজী, যিনি দীর্ঘদিন শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের আশা—
টিএস আইয়ুবের একটি ‘ইশারা’ পুরো ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। এ কারণে তাকেই আসনের ‘কিংমেকার’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জামায়াতের কৌশল
জেলা আমির ও বাঘারপাড়ার সন্তান অধ্যাপক গোলাম রসুল শুরু থেকেই মাঠে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয়।
তাঁরা বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও সংখ্যালঘু–আওয়ামী ভোটের ফাঁক–ফোকর কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
তবে শেষমুহূর্তে বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় জামায়াতের কৌশল ব্যর্থ হতে পারে বলে ধারণা।
আওয়ামী লীগ ভোট—সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা
৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ নেতারা আত্মগোপনে গেলেও সাধারণ কর্মীরা এলাকায় আছেন।
তারা যদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পান, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হবেন—এমন ইঙ্গিত স্থানীয়রা দিয়েছেন।
এই ভোট যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবে, তিনিই নির্দ্বিধায় এগিয়ে যাবেন।
সংখ্যালঘু ভোট—হিসাব পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে
বিশেষ করে ভবদহ অঞ্চলে সংখ্যালঘুর ভোট অনেক।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় তাঁদের মধ্যে ভয় এখনও কাটেনি।
তারা বলছেন—
“ভোট দিলেও দোষ, না দিলেও দোষ—তাই সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।”
বিএনপি–জামায়াত উভয় দলই তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে নিজেদের দিকে টানতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।










