Anzac Day উপলক্ষে প্রতি বছর অস্ট্রেলিয়াজুড়ে সাহস, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মূল্যবোধকে স্মরণ করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া অ্যানজ্যাক সৈনিকদের বীরত্ব এবং পরবর্তী প্রজন্মের সেনাসদস্যদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেশজুড়ে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। তবে মনোবিজ্ঞানী Clare Rowe মনে করেন, আধুনিক অস্ট্রেলীয় সমাজে পুরুষদের প্রতি যে সামাজিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা এই ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই সাংঘর্ষিক।
তার মতে, অ্যানজ্যাক দিবসে যেসব গুণকে সম্মান জানানো হয় — যেমন বিপদের মুখে এগিয়ে যাওয়া, দৃঢ় থাকা এবং দায়িত্ব পালন — বাস্তব জীবনে সেই একই বৈশিষ্ট্যকে অনেক সময় সন্দেহ, সমালোচনা কিংবা “টক্সিক ম্যাসকিউলিনিটি” হিসেবে দেখা হয়। ফলে তরুণ ছেলেদের কাছে পুরুষত্ব ও সাহসের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তিকর বার্তা পৌঁছাচ্ছে।
এবারের অ্যানজ্যাক দিবস আরও আলোচনায় এসেছে সাবেক সেনাসদস্য Ben Roberts-Smith-কে ঘিরে। আফগানিস্তানে সাহসিকতার জন্য ভিক্টোরিয়া ক্রস পাওয়া এই সাবেক স্পেশাল ফোর্স সদস্য বর্তমানে যুদ্ধকালীন পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত। যদিও তিনি নিজের নির্দোষ দাবি করছেন এবং জামিনে মুক্ত আছেন, তার মামলা অস্ট্রেলিয়াজুড়ে নতুন করে যুদ্ধের মানসিক প্রভাব, সেনাসদস্যদের ওপর চাপ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমাজ একদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতার প্রশংসা করে, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবনে একই ধরনের দৃঢ়তা বা আত্মনিয়ন্ত্রণকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে। এই দ্বৈত অবস্থান পুরুষদের মানসিকভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে।
অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরেই “মেটশিপ” বা সহযোদ্ধা বন্ধুত্ব এবং যুদ্ধকালীন সাহসিকতাকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরুষত্বের ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রায়ই সমালোচনার চোখে দেখা হচ্ছে। ছেলেদের একদিকে শক্ত ও দায়িত্বশীল হতে বলা হয়, আবার অন্যদিকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা আবেগ নিয়ন্ত্রণকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
যুদ্ধ ফেরত সেনাসদস্যদের অনেকেই অভিযোগ করেন, সমাজ তাদের প্রকাশ্যে সম্মান জানালেও ব্যক্তিগত জীবনে পুনর্বাসন ও মানসিক সহায়তায় পিছিয়ে থাকে। এর ফলে অনেক সাবেক সেনা হতাশা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বেকারত্ব ও আত্মহত্যার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
ক্লেয়ার রোয়ের মতে, “পজিটিভ ম্যাসকিউলিনিটি” বা ইতিবাচক পুরুষত্ব গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সাহস, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধকে পরিবার, সমাজ ও নেতৃত্বের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র সমালোচনা নয়, বরং তরুণদের জন্য স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় লিঙ্গ পরিচয়, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং ভেটেরান সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার মধ্যেই এই বিতর্ক আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মানসিক দৃঢ়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে।
২০২৬ সালের অ্যানজ্যাক দিবস তাই শুধু অতীতের বীরত্ব স্মরণের দিন নয়; এটি আধুনিক সমাজে পুরুষদের ভূমিকা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।










