বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভির চাহিদা আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করায় লিথিয়ামের দাম নতুন করে উর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের মন্দার পর অস্ট্রেলিয়ার লিথিয়াম খনি কোম্পানিগুলো বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজারে লিথিয়ামের দাম আবার টনপ্রতি প্রায় ৩ হাজার মার্কিন ডলারের দিকে এগোচ্ছে। সরবরাহ সংকট এবং ব্যাটারির চাহিদা দ্রুত বাড়ার কারণে বাজারে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান উত্থানের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টারের জন্য ব্যাটারি স্টোরেজের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক ভোক্তা এখন জ্বালানিচালিত গাড়ির বিকল্প হিসেবে ইভির দিকে ঝুঁকছেন। এতে লিথিয়ামভিত্তিক ব্যাটারির চাহিদা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজার ASX-এ তালিকাভুক্ত লিথিয়াম কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরও শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষভাবে লাভবান হয়েছে Pilbara Minerals, Liontown Resources, IGO Limited এবং Core Lithium-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ২০২২ সালের লিথিয়াম বুম-ধস চক্রের তুলনায় অনেক আলাদা।
তখন অতিরিক্ত খনি সম্প্রসারণের কারণে সরবরাহ এত বেড়ে গিয়েছিল যে পরবর্তীতে লিথিয়ামের দাম ৮০ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। এতে বহু কোম্পানি বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আগের ধসের পর নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং অনেক কোম্পানি উৎপাদন কমিয়েছে বা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত করেছে।
এখন বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ধারণা করছে, দশকের শেষ দিকে বৈশ্বিক বাজারে লিথিয়ামের বড় ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে লিথিয়ামের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। কারণ বিশ্বজুড়ে ইভি ব্যবহার বাড়ছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও এআই অবকাঠামোর জন্য বড় ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বাড়ছে।
এই উত্থানে China গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশটি লিথিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু অংশে নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করেছে এবং কিছু খনি কার্যক্রম সীমিত করেছে।
একই সঙ্গে চীন দ্রুত ইভি চার্জিং অবকাঠামো এবং ব্যাটারি উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো বিশ্ববাজারে সরবরাহ আরও টাইট করে তুলছে।
লিথিয়ামের দাম বাড়ায় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারি উপকরণ খাতেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
২০২৩ ও ২০২৪ সালের বড় ধসের সময় বহু অস্ট্রেলিয়ান লিথিয়াম কোম্পানির শেয়ার ব্যাপকভাবে পড়ে গিয়েছিল। কিছু প্রকল্প এতটাই অলাভজনক হয়ে পড়েছিল যে সেগুলো সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছিল।
এখন বাড়তি দামের কারণে সেই প্রকল্পগুলো আবার চালু করার আর্থিক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, লিথিয়াম বাজার এখনো অত্যন্ত অস্থির। চীনের নীতি, বৈশ্বিক ইভি চাহিদা, ব্যাটারি প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং খনি কোম্পানিগুলোর উৎপাদন পুনরায় শুরু করার গতির ওপর বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।
তারপরও অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, বৈশ্বিক বিদ্যুতায়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিথিয়াম আবারও অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির খাতে পরিণত হচ্ছে।










