কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের চাকরির পরিবর্তন আসতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে কর্মীদের সুরক্ষা দিতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে Singapore সরকার। দেশটির Economic Strategy Review (ESR)-এর অধীনে “Career Bridges” নামে একটি নতুন কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়েছে, যার লক্ষ্য চাকরি হারানোর আগেই কর্মীদের নতুন পেশায় স্থানান্তরের জন্য প্রস্তুত করা।
সিঙ্গাপুর সরকারের প্রকাশিত ESR-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মোট ৩২টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ওপর কেন্দ্রীভূত।
সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাব হলো “Career Bridges” বা ক্যারিয়ার সেতু। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত মানুষদের আগেভাগেই শনাক্ত করে তাদের আরও স্থিতিশীল ও ভবিষ্যৎ-নিরাপদ পেশায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে।
এই পরিকল্পনায় থাকবে বিশেষ প্রশিক্ষণ, দক্ষতা মূল্যায়ন, ক্যারিয়ার পরামর্শ এবং নতুন চাকরির সঙ্গে সংযোগ তৈরির ব্যবস্থা। সরকারের ধারণা, এতে কর্মীরা হঠাৎ চাকরি হারানোর ধাক্কা কম অনুভব করবে এবং দ্রুত নতুন পেশায় মানিয়ে নিতে পারবে।
সিঙ্গাপুরের নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করেছেন যে AI ও অটোমেশন এখন শুধু কারখানার কাজ নয়, বরং অফিসভিত্তিক সাদা-কলারের চাকরি ও মাঝারি দক্ষতার পেশাগুলোকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
উপ-প্রধানমন্ত্রী Gan Kim Yong বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে কর্মীদের জন্য শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে সিঙ্গাপুরে কোনো কোম্পানি কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সরকারকে জানায়। কিন্তু ESR কমিটি প্রস্তাব দিয়েছে, ভবিষ্যতে যেন ছাঁটাইয়ের আগেই সরকারকে জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়। এতে কর্মীরা আগাম কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ এবং বিকল্প চাকরির সুযোগ খুঁজে পাওয়ার সময় পাবে।
আরেকটি বড় সুপারিশ হলো AI-প্রতিরোধী বা তুলনামূলক নিরাপদ খাতগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সেবা, প্রাথমিক শিক্ষা, দক্ষ কারিগরি পেশা এবং সহায়ক স্বাস্থ্যখাত।
সরকার মনে করছে, এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
প্রতিবেদনটি প্রযুক্তির বিরোধিতা নয়, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষকে মানিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, AI যেন কর্মীদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন না করে বরং তাদের কাজকে আরও কার্যকর করে তোলে, সেই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের বড় ব্যাংক DBS Bank-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি AI ব্যবহার বাড়ালেও একই সঙ্গে কর্মীদের নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বিন্যাস করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগ শুধু চাকরি রক্ষার পরিকল্পনা নয়; বরং ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য পুরো শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করার কৌশল।
কারণ বর্তমান বিশ্বে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা এবং AI-নির্ভর প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অর্থনীতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।
সিঙ্গাপুর সরকার মনে করছে, ভবিষ্যতে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হবে শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং কত দ্রুত একটি দেশের কর্মীরা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে—সেই সক্ষমতায়।










