অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম Australian Broadcasting Corporation বা এবিসি আবারও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। এক কড়া মতামতমূলক নিবন্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পড়েছে, সাংস্কৃতিকভাবে সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং নিজেদের জনস্বার্থমূলক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে এবিসিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে পরিবারের এক “অপ্রিয় আত্মীয়” বা “আন্টি” হিসেবে তুলনা করা হয়েছে। লেখকের দাবি, সম্প্রচারমাধ্যমটি ধীরে ধীরে এমন এক আদর্শিক অবস্থানে চলে গেছে যেখানে ভিন্নমত বা মূলধারার সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।
নিবন্ধের শুরুতে তুলনামূলক হালকা মেজাজে জনপ্রিয় ব্রিটিশ পুলিশ সিরিজ The Bill বন্ধ করার প্রসঙ্গ তোলা হয়। লেখক রসিকতার ভঙ্গিতে দাবি করেন, সিরিজটিতে পুলিশকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হতো বলেই এবিসি এটি সম্প্রচার বন্ধ করেছে—যা নাকি বর্তমান সম্প্রচার সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়।
এরপর সমালোচনা আরও বিস্তৃত হয়ে এবিসির সম্পাদকীয় নীতি ও তাদের চার্টার বা সাংবিধানিক দায়িত্বের দিকে গড়ায়। লেখকের মতে, এবিসির দায়িত্ব ছিল অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পরিচয় ও সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করা, কিন্তু বাস্তবে তারা সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে এবিসির চার্টারের একটি আইনি ধারা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে কিছু দায়বদ্ধতা আদালতের মাধ্যমে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য নয়। লেখকের দাবি, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন ধারা থাকলে এবিসিই সম্ভবত সেটির কঠোর সমালোচনা করত।
নিবন্ধে অতীতের এবিসির জনপ্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের কথাও স্মরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে জনপ্রিয় সংগীত অনুষ্ঠান Countdown এবং এর উপস্থাপক Molly Meldrum-এর সময়কে এমন এক যুগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যখন এবিসি সাধারণ অস্ট্রেলিয়ান সংস্কৃতি ও বিনোদনের আরও কাছাকাছি ছিল।
এছাড়া প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সরকারি অর্থায়ন পাওয়ার পরও এবিসি কি বর্তমান অবস্থায় সেই অর্থায়নের যোগ্য? লেখকের মতে, প্রতিষ্ঠানটিকে বরং সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক পরিষেবায় রূপান্তর করা যেতে পারে, ঠিক বাণিজ্যিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো।
কমে যাওয়া দর্শকসংখ্যার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের মতে, করদাতাদের অর্থ দিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম পরিচালনা করা কতটা যৌক্তিক—তা নিয়ে এখন নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রতিবেদনটি ২০২১ সালের Four Corners অনুষ্ঠানের একটি অনুসন্ধানও পুনরায় সামনে আনে, যেখানে ১৯৭৯ সালের Luna Park Ghost Train Fire দুর্ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছিল। লেখকের অভিযোগ, তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ অনুরোধ করলেও এবিসি নাকি অপরিবর্তিত সাক্ষাৎকার ফুটেজ ও উপকরণ সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
নিবন্ধের শেষ অংশে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু ও ইহুদি সম্প্রদায় সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এবিসির ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। সাবেক এবিসি পরিচালক Joe Gersh-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সম্প্রচারমাধ্যমটি ইহুদিবিদ্বেষ সম্পর্কিত বিতর্কে “সমস্যার অংশ” হয়ে উঠেছে।
পুরো বিতর্কটি আসলে অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিনের এক রাজনৈতিক ও সামাজিক তর্কেরই নতুন অধ্যায়। সমালোচকদের দাবি, এবিসি ক্রমশ বামঘেঁষা রাজনৈতিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, এটি এখনো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থভিত্তিক গণমাধ্যম, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সংবাদ ব্যবসার অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়ায় এবিসির ভবিষ্যৎ, অর্থায়ন ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।










