Home বাংলাদেশ ‘নীতিগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন’ না করলে ঢাকায় প্রভাব হারাতে পারে ভারত

‘নীতিগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন’ না করলে ঢাকায় প্রভাব হারাতে পারে ভারত

126
0

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতি ভারতের আস্থার পরিমাণ বোঝাতে শেখ হাসিনারই একটি মন্তব্য ছিল যথেষ্ট—”ভারতকে যা দিয়েছি, তারা সারাজীবন মনে রাখবে”। কিন্তু গত জুলাইয়ের গণআন্দোলনের মাধ্যমে তার পতন শুধু আওয়ামী লীগকেই বিপদে ফেলেনি, একই সঙ্গে ভারতকেও ফেলেছে গভীর কৌশলগত সংকটে।

এখন দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা ও তার অনুসারীদের প্রতি আগের সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। এই দ্বৈত অবস্থান সামাল দিতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত হাসিনামুখী নীতিকেই বেছে নেয় ভারত সরকার।

বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য ভারতের কেন্দ্র সরকার সম্প্রতি একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে আছেন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। এই কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে—ভারত যদি এখনই তার নীতিগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা না করে, তাহলে যুদ্ধ না হলেও কৌশলগতভাবে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ঢাকায় নিজের প্রভাব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

কমিটি বলেছে, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। যদিও তারা মনে করে পরিস্থিতি এখনই পূর্ণ বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্যে নামবে না, তবুও এটি অত্যন্ত সতর্কভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

কমিটির বিশ্লেষণে বেশ কিছু কারণকে চলমান অস্থিরতার মূল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে—

  • ইসলামপন্থি উগ্রবাদ পুনরুত্থান,
  • চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি,
  • এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আধিপত্যের পতন।

তাদের মতে, ১৯৭১ সালের সংকট ছিল অস্তিত্বগত, কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রজন্মভিত্তিক বিভাজনের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভারতের কৌশলগত প্রভাব থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

কমিটি বিশেষভাবে সতর্ক করেছে চীনের ব্যাপক সম্পৃক্ততা নিয়ে—অবকাঠামো উন্নয়ন, সমুদ্রবন্দর সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—সব জায়গাতেই চীন সক্রিয়ভাবে জড়িত। উদাহরণ হিসেবে মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ, লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি এবং পেকুয়ার সাবমেরিন ঘাঁটির কথা বলা হয়েছে, যেখানে আটটি সাবমেরিন রাখার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে বাংলাদেশের হাতে আছে মাত্র দুটি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, চীন এখন বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলছে—এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর মতো ইসলামপন্থি দলও রয়েছে, যার প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে চীন সফরও করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে কমিটি সুপারিশ করেছে,

  • বাংলাদেশে কোনো বিদেশি শক্তির সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগ কঠোর নজরদারির আওতায় রাখতে হবে,
  • এবং ভারতকে বাণিজ্যিক, উন্নয়নমূলক ও লজিস্টিক সুবিধা দিতে ঢাকার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সুবিধাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ফেরার ইঙ্গিত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি। বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ থাকা দলটির নিবন্ধন পুনরায় বৈধ হওয়ায় তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে দলটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, যা ভবিষ্যতের নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

কমিটির ভাষায়, “আওয়ামী লীগের ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যৎ যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here