বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন ইচ্ছা করেই বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) বিএনপির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। এতে দেশের রাজনীতি আবারো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে এবং বিরাজনীতিকরণের আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে।
৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপিই রাজনীতির মাঠে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে। এখন অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিএনপিকেও ‘মাইনাস’ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে—এটা কি এক ধরনের ‘নতুন এক-এগারো’?
বর্তমানে দেশে সংস্কারের নামে যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটি নির্বাচনকে অনিশ্চিত করতেই পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের অনাগ্রহ তাদের নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়া জরুরি। অথচ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাপানে গিয়ে বলেন, ডিসেম্বরের নির্বাচন একমাত্র একটি দলের চাওয়া। এটি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, কারণ অধিকাংশ নিবন্ধিত দলই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন চায়।
বহু রাজনৈতিক দল এবং জনগণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বপ্ন দেখেছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও নির্বাচন নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। সরকারের মনোযোগ বরং অন্যান্য কাজে বেশি—যার মধ্যে রয়েছে সংস্কার ও বিচার। অথচ এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেগুলো নির্বাচন বিলম্বিত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ব্যাপারে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সম্মত হলেও এ সংস্কার বাস্তবায়নের এখতিয়ার সংসদের, অন্তর্বর্তী সরকারের নয়। তাই নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক মতবিরোধ গণতন্ত্রের অংশ, সব বিষয়ে দলগুলোর পূর্ণ ঐকমত্য গণতন্ত্র নয় বরং একরকম ‘বাকশালী’ ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। তাই নির্বাচন না হলে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
সরকারের দায়িত্ব নিরপেক্ষ থাকার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো, যেমন ইশরাক হোসেনের মেয়র পদে শপথ বিলম্ব, অথবা আরাকান আর্মির বিষয়ে গোপন পদক্ষেপ, এসবই ইঙ্গিত দেয় সরকার পক্ষপাতদুষ্ট ও নির্দিষ্ট মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত।
বিএনপির বিরোধিতাই এখন সরকারের একমাত্র প্রতিবন্ধকতা। চট্টগ্রাম বন্দর হস্তান্তর, রাখাইন করিডর কিংবা রাষ্ট্রপতির অপসারণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিএনপি বাধা সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে হয়তো বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি এতদিন এই সরকারের প্রতি সহনশীল ছিল। ড. ইউনূসের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। তবে সরকারের কার্যক্রমে বিরক্তি ও অসন্তোষ বাড়ছে। যে কোনো সময় নতুন করে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হতে পারে। সেটাই হবে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের দ্বিতীয় অধ্যায়, যেখানে নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ—গণতন্ত্রের পথে, না বিদেশি স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত এক প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে।










