সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদমাধ্যমে ভুয়া তথ্য বা ‘ফেক নিউজ’ এখন শুধুমাত্র বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে না, বরং এটি সমাজ, রাজনীতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও গভীর সংকটে ফেলছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ভুয়া তথ্য শনাক্ত এবং যাচাইয়ের হার আগের বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
ডিসমিসল্যাবের জানুয়ারি ২০২৪ এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরে ৩ হাজারেরও বেশি বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ রাজনীতি সংক্রান্ত ছিল। ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে ভুয়া তথ্য আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষভাবে ভাইরাল হয়েছে।
মিথ্যা তথ্য শুধু ব্যক্তির মানহানি বা ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতে একযোগে বিদ্বেষমূলক বিভ্রান্তিকর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভুয়া খবর ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।
এছাড়াও, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে মিথ্যাচারের একটি বড় ঘটনা সম্প্রতি ঘটে। ৩ জুন রাতে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন), ২০২৫’ অধ্যাদেশ জারি হয়, যেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বাতিলের কোনও প্রসঙ্গ ছিল না। তবে ওই রাতেই একটি প্রথম সারির দৈনিকে বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়ানো হয়, এবং একযোগে অনেক গণমাধ্যমে এই ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও ভুল তথ্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
এদিকে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভুয়া তথ্য ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশ ছাড়ছে বলে ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। একই সময়ে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালক ভারতীয় নাগরিক। আন্দোলনরত ছাত্রনেতাদের ছবি বিকৃত করে বলা হয়, তারা চরমপন্থী বা জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। এছাড়া, পুরনো মিছিলে তোলা ছবি দিয়ে বলা হয়, হাইকোর্ট ছাত্রলীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।
এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য সাধারণ মানুষকে ভুল বার্তা দেয় এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ করে। গণমাধ্যমের মূল শক্তি হল সত্য ও নিরপেক্ষতা। যখন যাচাই না করে ভুয়া সংবাদ প্রচারিত হয়, তখন পাঠক সংবাদমাধ্যমের উপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, প্রতিটি গণমাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট থাকা উচিত, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই করে প্রতিবেদন তৈরি করবে। সরকারকেও আইনগত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেন উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়। এছাড়া, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ‘মিডিয়া লিটারেসি’ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ নাগরিকরা তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন হয়।
সোশ্যাল মিডিয়া বর্তমানে মানুষের চিন্তা, আচরণ এবং রাজনৈতিক মতামত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে, যখন এটি ভুল তথ্যের বাহক হয়ে ওঠে, তখন তা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা তীব্র, ভুয়া তথ্য দেশের নিরাপত্তা, সম্প্রীতি এবং গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এখনই সচেতনতা না বাড়ালে, ভবিষ্যতে তথ্যের যুদ্ধ বাস্তব যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।










