Home বিশ্ব ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

358
0

যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে আনতে বিভিন্ন কূটনৈতিক কৌশল ও প্রস্তাব ব্যবহার করছে। এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পে অর্থ সহায়তা, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের ছয় বিলিয়ন ডলারের অর্থ ছাড়ের মতো প্রস্তাব।

সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক প্রভাবশালী দেশ তেহরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধবিরতির পর এই আলোচনাগুলো আরও গতি পেয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক গোপন বৈঠকে, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে মিলে একটি নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করেন—যার আওতায় ইরানের জন্য একটি নতুন বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে শর্ত রয়েছে, কর্মসূচিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চলবে না। এই অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং তাদের আরব মিত্রদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট—ইরান যদি চায়, তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রকল্প পরিচালনা করতে পারে, তবে ইউরেনিয়াম নিজেরা সমৃদ্ধ করতে পারবে না। চাইলে তারা বিদেশ থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানি করতে পারে।

এই আলোচনা চলেছে মূলত কাতারের মধ্যস্থতায়। সূত্র জানায়, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির পেছনেও কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, এবং ভবিষ্যতে যাতে পুনরায় সংঘর্ষ না বাধে, সেজন্য কাতার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে ধোঁয়াশা

ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ কোথায় আছে—তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে এটি ছিল ফোর্দোতে, আবার কেউ কেউ বলছেন নাতাঞ্জ বা ইস্পাহানেও মজুদ ছিল। এসব স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও পর্যালোচনার বিষয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ইরানের ৬০ শতাংশ মাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম বর্তমানে কোথায় আছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না। এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে, কারণ ইরান ঘোষণা দিয়েছে তারা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) থেকে বেরিয়ে আসছে। এর ফলে এখন থেকে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। IAEA থেকে বের হয়ে গেলে ইরান তাদের পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে কার্যত স্বাধীন হয়ে যাবে—যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথও উন্মুক্ত করে দিতে পারে। অন্য দেশগুলো এই পথ অনুসরণ করতেও উদ্বুদ্ধ হতে পারে।

পারমাণবিক বোমার আশঙ্কা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাংবাদিক জুলিয়ান বার্গার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান এখন এমন অবস্থানে আছে যেখানে তারা পরমাণু বোমা তৈরির চিন্তা করতেই পারে। তাঁর মতে, যদিও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কিছুটা ক্ষতি হয়েছে, তবুও তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

বার্গারের দাবি, ইরান প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লুকিয়ে রেখেছে, যা দিয়ে প্রায় ১০টি পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব। তাঁর মতে, উত্তর কোরিয়ার মতোই ইরান ভাবতে পারে যে কেবল পরমাণু অস্ত্রই এমন হামলা থেকে রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে—না হলে ইরাক বা লিবিয়ার মতো পরিণতির আশঙ্কা থাকবে।

তবে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের ওপর এখন নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে সরে আসার জন্য। ইরানের জন্য এটি হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শ

ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সহযোগিতা চাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এক ফোনালাপে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সবসময় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনার স্বীকারোক্ত

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্বীকার করেছেন যে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর। তবে তাঁকে খুঁজে না পাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কাটজ জানান, খামেনি এই হুমকির বিষয়ে অবগত ছিলেন এবং তাই তিনি গভীর সুরক্ষিত বাংকারে আত্মগোপনে চলে যান।

এই পুরো প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন কৌশলগতভাবে ইরানকে আলোচনায় আনতে মরিয়া। তবে তেহরানের প্রতিক্রিয়া এবং ইসরায়েলের চাপের মাঝে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here