উত্তরবঙ্গের মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় নির্বাচন–ইস্যু এখন তিস্তা নদী ও এর ভাঙন। কৃষক, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দোকানি কিংবা দিনমজুর—সব শ্রেণির মানুষই বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেই নদীপারের মানুষের জীবনে শান্তি ফিরবে।
শীতেও থামেনি তিস্তার ভাঙন
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের দক্ষিণ বালা পাড়া গ্রামে গত এক মাস ধরে তিস্তার ভাঙন অব্যাহত। গ্রামের সামনে চরভূমি নিয়মিত নদীতে মিশে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, আরও কয়েক দিনের মধ্যেই ভাঙন গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
শনিবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়—তিস্তা সামান্য বাঁক নিয়ে গ্রামমুখী হয়েছে, আর সেই চাপেই ধীরে ধীরে ফসলি জমি, চর ও বালুচর নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই কানে আসে শ্যালো মেশিনের শব্দ আর চর ভাঙে পড়ার গর্জন।
গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের হাহাকার
স্থানীয় কৃষক মো. আবু বক্কার সিদ্দিকীর তিন বিঘা জমিতে সূর্যমুখী, রসুনসহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে। তিনি আশঙ্কা করেন, ভাঙন চলতে থাকলে তাঁর ফসলও নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
তার ভাষায়—
“সরকার বলে অনেক কিছু—তিস্তা খনন করবে, ভাঙন রোধ করবে—কিন্তু কিছুই হয় না।”
মোর্শেদা বেগম (৬০) জানান, বিয়ের পর থেকে ২৫ বার তাঁরা বাড়ি বদলাতে বাধ্য হয়েছেন—সবই তিস্তায় বিলীন হওয়ার কারণে। পাশের রাশেদুল ইসলাম বলেন, “এই এলাকায় স্থায়ী ঘরবাড়ি করা যায় না, কারণ ভাঙনে সব সময়ের ঝুঁকি।”
এ অঞ্চলের প্রায় সব মানুষই তিস্তার স্থায়ী সমাধান চান।
তিস্তায় দারিদ্র্য কেন কমছে না
লালমনিরহাট দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আবু হাসনাত রানা বলেন—
“তিস্তা মহাপরিকল্পনা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয় ইস্যু। কিন্তু এটি একটি আন্তর্জাতিক সমঝোতার বিষয়ও। বাংলাদেশ, ভারত ও চীন—সব পক্ষের সম্মতি ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”
তিস্তার ধারা কোথা দিয়ে, ক্ষতি কীভাবে
তিস্তা নদীর উৎপত্তি হিমালয়ে। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ অংশে তিস্তারের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৫ কিলোমিটার।
গবেষণা বলছে—
- ভারত অংশে একাধিক বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ ৮০–৯০% কমেছে
- শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় সেচ খরচ ৩০০% পর্যন্ত বেড়েছে
- বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নেমে এসে তিস্তার দুই পাড়েই ভয়াবহ বন্যা হয়
- ২০২০ সালে তিস্তার ভাঙনে ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে
ভোটারের চোখে তিস্তা মহাপরিকল্পনা
মহিষখোঁচা বাজারের এক চায়ের দোকানে বসে কথা হয় ২৫ বছর বয়সী উজ্জ্বল মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, ২০২৪ সালে ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ভোট আগেই কেউ দিয়েছে। এবার তিনি নিজের ভোট নিজে দিতে চান।
তিস্তাকে ঘিরে প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন—
“মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তা এলাকায় স্থায়ী সমাধান আসবে।”
দোকানমালিক সিরাজুল জানান, তাঁরা শুনেছেন নদীর দুই পাড়ে বাঁধ ও শিল্প স্থাপন হবে। অন্যদিকে কাপড় ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম মনে করেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ লাগবে, তবে ভারতের সহযোগিতাও অপরিহার্য।
চরবাসী রাশেদুল ইসলাম বলেন—
“তিস্তা খনন হলে অনেক জমি জেগে উঠবে, কৃষিও বাড়বে।”
মহাপরিকল্পনায় কী আছে
সরকারের ‘তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এ অন্তর্ভুক্ত—
- নদী খনন
- বাঁধ নির্মাণ
- নদীপাড়ে স্যাটেলাইট শহর
- বালু অপসারণ
- নতুন কৃষিজমি উদ্ধার
- ভূমি উন্নয়ন
- চর উন্নয়ন
তিস্তার ইস্যুটি এখন কেবল নদীতীরবর্তী জেলা নয়—পুরো রংপুর বিভাগ জুড়ে নির্বাচনী আলোচনার শীর্ষে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি
লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের আমির ও লালমনিরহাট–৩ আসনের প্রার্থী মো. আবু তাহের বলেন—
“তিস্তা সমস্যা সমাধান আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। চীনের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত।”
বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন—
“তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিএনপির অগ্রাধিকার। পানির ন্যায্য হিস্যা এবং তিস্তাপারের কোটি মানুষের দুর্দশা দূর—দুটিই আমাদের প্রতিশ্রুতি।”










