Home এশিয়া পেসিফিক বুমার থেকে নবজাতক: অস্ট্রেলিয়ার নতুন বাজেট কোন প্রজন্মের জন্য কী নিয়ে এলো?

বুমার থেকে নবজাতক: অস্ট্রেলিয়ার নতুন বাজেট কোন প্রজন্মের জন্য কী নিয়ে এলো?

18
0

অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ সালের ফেডারেল বাজেটকে সরকার “ইন্টারজেনারেশনাল ইকুইটি” বা প্রজন্মভিত্তিক ন্যায্যতার বাজেট হিসেবে তুলে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী Anthony Albanese এবং ট্রেজারার Jim Chalmers বলছেন, ক্রমবর্ধমান প্রজন্মগত সম্পদ বৈষম্য কমানোই এবার সরকারের মূল লক্ষ্য।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও সরকার এমন এক বাজেট ঘোষণা করেছে, যেখানে কর ব্যবস্থা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সহায়তা খাতে বড় পরিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজন্মকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করা হবে।

বেবি বুমারদের জন্য মিশ্র বাস্তবতা

৬০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী বেবি বুমাররা এখনও অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ধনী প্রজন্ম। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান KPMG-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের গড় সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৪.৬ লাখ ডলার।

তবে নতুন বাজেটে এই প্রজন্মকে কিছু চাপের মুখেও পড়তে হবে। সরকার বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আগামী চার বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করবে। এর ফলে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ৩০ লাখের বেশি অস্ট্রেলিয়ানের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম ৪ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, সেই অর্থের বড় অংশ প্রবীণদের সেবায় ব্যয় করা হবে। সরকার অতিরিক্ত ৫,০০০ এজড কেয়ার বেড, “সাপোর্ট অ্যাট হোম” প্রোগ্রাম এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যা সেবার জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। এছাড়া ডিমেনশিয়া পরিকল্পনা, এজড কেয়ার প্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবায়ও নতুন বিনিয়োগ আসছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল বেনিফিটস স্কিমে আরও ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করায় প্রোস্টেট, ফুসফুস ও ব্লাডার ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত বয়স্করা উপকৃত হবেন।

জেন এক্স: সম্পদ আছে, চাপও আছে

৪৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী Generation X বা জেন এক্স প্রজন্মের হাতে সবচেয়ে বেশি সম্পত্তি রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, বাড়ি কেনা এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভালের আর্থিক চাপও বহন করছেন।

নতুন বাজেটে ডিসক্রিশনারি ফ্যামিলি ট্রাস্টগুলোর ওপর ন্যূনতম ৩০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে, যা বহু পরিবার ও ব্যবসায়িক কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। আগে অনেক পরিবার কর কমাতে আয় বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে ভাগ করে দিত।

এছাড়া নেগেটিভ গিয়ারিং সুবিধা শুধুমাত্র নতুন নির্মাণে সীমাবদ্ধ হওয়ায় জেন এক্স বিনিয়োগকারীদের জন্য পুরনো বাড়িতে বিনিয়োগ কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তবে যারা ইতোমধ্যে এই সুবিধা পাচ্ছেন, তারা আগের নিয়মেই সুবিধা চালিয়ে যেতে পারবেন।

একই সঙ্গে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সহায়তায় সরকার নতুন “ক্যারার ইনক্লুসিভ ওয়ার্কপ্লেস ইনিশিয়েটিভ” চালু করছে।

মিলেনিয়ালদের জন্য বড় আবাসন আশা

৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী Millennials প্রজন্ম বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত প্রজন্ম। বাড়ির দাম বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের কারণে অনেকেই আবাসন বাজারে প্রবেশ করতে পারেননি।

সরকারের নতুন CGT ও নেগেটিভ গিয়ারিং সংস্কার মূলত এই প্রজন্মকে লক্ষ্য করেই আনা হয়েছে। সরকার আশা করছে, বিনিয়োগকারীদের কর সুবিধা কমালে পুরনো বাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা কমবে এবং আরও ৭৫,০০০ অস্ট্রেলিয়ান প্রথম বাড়ি কেনার সুযোগ পাবেন।

এছাড়া নতুন বাড়িতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর সুবিধা বহাল থাকায় নতুন নির্মাণ খাতও চাঙ্গা হবে বলে সরকারের বিশ্বাস।

প্রযুক্তি খাতেও মিলেনিয়ালদের জন্য ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। গবেষণা ও উন্নয়নে কর সুবিধার সীমা ১৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছে, যা স্টার্টআপ ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করবে।

তবে উদ্বেগের জায়গাও আছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ঋণ ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই প্রজন্মকেই বড় সুদ পরিশোধের বোঝা বহন করতে হবে। আগামী অর্থবছরে সরকারি ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হবে প্রায় ৩১.৯ বিলিয়ন ডলার।

জেন জেডের জন্য চাকরি ও শিক্ষা সুযোগ

১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী Generation Z বা জেন জেড প্রজন্ম উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম আয় এবং আবাসন সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে।

নতুন বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে আগামী এক দশকে ৫৩ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা তরুণদের জন্য নতুন চাকরি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করবে।

বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও ক্যাম্পাসে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় টারশিয়ারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস এজেন্সিকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হবে। এছাড়া চাকরিপ্রার্থীদের সহায়তায় ন্যাশনাল কাস্টমার সার্ভিস লাইনের জন্যও নতুন অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

আবাসন সংকট মোকাবিলায় আবাসিক নির্মাতাদের দ্রুত স্বীকৃতি ও প্রশিক্ষণের জন্যও নতুন তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।

শিশুদের জন্য শিক্ষা ও সহায়তা

১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সরকার “থ্রাইভিং কিডস” নামে একটি বড় কর্মসূচি চালু করছে। অটিজম ও বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের সহায়তায় আগামী পাঁচ বছরে ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে।

এছাড়া STEM শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, গণিত শিক্ষা এবং অনলাইন মূল্যায়ন প্ল্যাটফর্ম উন্নয়নে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

স্কুলভিত্তিক খেলাধুলা কর্মসূচি ও যুব ক্রীড়া অংশগ্রহণ বাড়াতে ৫০.৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।

অন্যদিকে, গৃহহীনতার ঝুঁকিতে থাকা ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের সহায়তায় ৫৯.৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে, যা প্রায় ৪,০০০ তরুণকে সহায়তা দেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বাজেট মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল, যেখানে সরকার প্রবীণ ও সম্পদশালী প্রজন্মের কর সুবিধা কমিয়ে তরুণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে একই সঙ্গে বাড়তি কর, ঋণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকিও নিয়ে বিতর্ক তীব্র হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here