মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে পাকা ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি এবং বন্ধক নিয়ে চাষ করা কৃষকেরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকের বছরের একমাত্র ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে।
পানির নিচ থেকে যে ধান কষ্ট করে উদ্ধার করা হচ্ছে, সেটিও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভেজা ধান দ্রুত পচে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে আঁটির ভেতরেই অঙ্কুর গজাচ্ছে। চারদিকে পচা ধানের গন্ধ আর কৃষকদের হতাশার আর্তনাদে হাওরপারের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
কৃষকেরা জানান, ধান কাটার পর তা আনা-নেওয়ায় খরচ এত বেশি যে বিক্রি করেও সেই খরচ ওঠানো যাচ্ছে না। শ্রমিক সংকট, নৌকার অভাব এবং অতিরিক্ত ভাড়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বর্তমানে ৪০–৫০ আঁটি ধান তুলতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৪০০–৫০০ টাকা, আর শ্রমিক মজুরি ৮০০–১,০০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে উৎপাদনের চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যাচ্ছে।
রাজনগর এলাকার গোপাল নুনিয়া নামের এক কৃষক জানান, তিনি ইজারা নেওয়া জমির খুব অল্প অংশ থেকে ধান তুলতে পেরেছেন। যে পরিমাণ ধান পেয়েছেন, তা তুলতে খরচই হয়েছে কয়েক হাজার টাকা—যা বিক্রির দামে উঠে আসছে না। অন্যদিকে, জলিল মিয়া বলেন, তিনি বন্ধক নেওয়া জমির বেশিরভাগ ফসলই পানির নিচে হারিয়েছেন, আর নৌকার অভাবে কাটা ধানও পড়ে আছে পানিতে।
অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে নিজেদের ফসল ফেলে অন্যের ধান পরিবহনের কাজ করছেন জীবিকার জন্য। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা নিজের খেত থেকে ধান তুলতে না পেরে এখন নৌকা ভাড়া নিয়ে অন্যের কাজ করছেন।
কাউয়াদীঘি হাওরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কিছুটা রোদ উঠলেই কৃষকেরা মরিয়া হয়ে ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন—কেউ উঁচু জায়গায় ধান রাখছেন, কেউ ভেজা ধান শুকাচ্ছেন, আবার কেউ পানির মধ্যেই মাড়াই করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই ধান আবার পানিতে ডুবে যাচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, পচা বা ভেজা ধান ক্রেতারা কিনতে চাইছেন না, আর কিনলেও দিচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। ফলে তারা চরম দোটানায় পড়েছেন—ফসল ফেলে আসতেও পারছেন না, আবার তুলেও লাভ পাচ্ছেন না।
এদিকে কৃষকদের ক্ষতি পূরণ ও ফসল রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্থানীয়ভাবে আন্দোলন শুরু হয়েছে। হাওর রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৩৪৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য সেচ কার্যক্রম চললেও টানা ভারী বৃষ্টির কারণে দ্রুত পানি নামানো সম্ভব হচ্ছে না।










