Home চাকরি এক চাকরিতে বেশি দিন থাকলেই ক্ষতি!” — অস্ট্রেলিয়ান কর্মীদের সতর্ক করলেন অর্থনীতিবিদরা

এক চাকরিতে বেশি দিন থাকলেই ক্ষতি!” — অস্ট্রেলিয়ান কর্মীদের সতর্ক করলেন অর্থনীতিবিদরা

52
0

অস্ট্রেলিয়ার কর্মীদের জন্য নতুন এক অর্থনৈতিক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য—একই চাকরিতে দীর্ঘদিন থেকে যাওয়া অনেক কর্মীর জন্য আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি এক ধরনের “লয়্যালটি ট্যাক্স”, যেখানে প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্যের বিনিময়ে কর্মীরা কম বেতন ও ধীর ক্যারিয়ার উন্নয়নের ফাঁদে পড়ছেন।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান e61 Institute-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত চাকরি পরিবর্তন করেন তারা সাধারণত একই প্রতিষ্ঠানে থেকে যাওয়া কর্মীদের তুলনায় গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ বেশি বেতন বৃদ্ধি পান। একজন গড় অস্ট্রেলিয়ান কর্মীর ক্ষেত্রে এটি বছরে প্রায় ৫৭০০ ডলার অতিরিক্ত আয়ের সমান।

তরুণ কর্মীদের জন্য এই ব্যবধান আরও বড়। ২১ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে যারা চাকরি বদল করেন, তারা একই চাকরিতে থাকা কর্মীদের তুলনায় বছরে প্রায় ৭৫০০ ডলার বেশি আয় করতে পারেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন কর্মী নিয়োগের সময় কোম্পানিগুলো বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে মিল রেখে উচ্চ বেতন দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু পুরনো কর্মীরা সাধারণত বছরে সীমিত ইনক্রিমেন্ট পান, যদিও সময়ের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব দুটোই বাড়ে।

এই কারণেই “লয়্যালটি ট্যাক্স” শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কর্মীরা নতুন যোগ দেওয়া সহকর্মীদের তুলনায় কম বেতন পাচ্ছেন—যদিও তাদের অভিজ্ঞতা বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও বড়। কারণ একবার বেশি বেতন পাওয়া শুরু হলে ভবিষ্যতের ইনক্রিমেন্ট, সুপারঅ্যানুয়েশন এবং পরবর্তী বেতন আলোচনার ভিত্তিটাও উচ্চ হয়ে যায়। ফলে চাকরি পরিবর্তনের আর্থিক সুবিধা সময়ের সঙ্গে আরও বাড়তে থাকে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, শুধু বেতন নয়—একই পদে দীর্ঘদিন থাকলে দক্ষতার উন্নয়নও সীমিত হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে কর্মক্ষেত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে নতুন দক্ষতা অর্জন এবং অভিযোজন ক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Jobs and Skills Australia জানিয়েছে, AI পুরো চাকরি ধ্বংস করার বদলে মূলত কাজের ধরন পরিবর্তন করবে। তাই যেসব কর্মী প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা এবং অভিযোজনযোগ্যতা বাড়াতে পারবেন, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে তারাই বেশি প্রতিযোগিতামূলক থাকবেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যারা নিয়মিত নতুন চাকরি বা ভূমিকা গ্রহণ করেন তারা বিভিন্ন প্রযুক্তি, দায়িত্ব এবং শিল্পখাত সম্পর্কে বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অন্যদিকে একই বিশেষায়িত ভূমিকায় দীর্ঘদিন থাকলে অনেকের দক্ষতা একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই প্রবণতার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়ছে। Grattan Institute-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯০-এর দশক থেকে অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি পরিবর্তনের হার কমছে, যা দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে দুর্বল করেছে।

অস্ট্রেলিয়ান ট্রেজারিও মনে করছে, কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ বাড়লে বেতন বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং অর্থনীতি কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

এ কারণে সরকার সম্প্রতি “নন-কমপিট ক্লজ”, “ওয়েজ-ফিক্সিং” এবং “নো-পোচ” ধরনের কর্মী সীমাবদ্ধতা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা ও কর্মী চলাচল বাড়ে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কও করেছেন। অতিরিক্ত ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন করলে কিছু নিয়োগকর্তা কর্মীদের “সিরিয়াল জব হপার” হিসেবে দেখতে পারেন। এতে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিধায় পড়তে পারে।

ক্যারিয়ার পরামর্শদাতারা বলছেন, কর্মীদের নিয়মিত মূল্যায়ন করা উচিত তাদের বর্তমান চাকরি এখনো পর্যাপ্ত বেতন, দক্ষতা উন্নয়ন, কাজের নমনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ সুযোগ দিচ্ছে কি না। শুধুমাত্র নিরাপত্তাবোধ বা অভ্যাসের কারণে একই চাকরিতে থেকে যাওয়া ভবিষ্যতে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তবে তারা এটাও স্বীকার করেন যে, পরিবার, কর্মপরিবেশ, সংস্কৃতি বা সম্ভাব্য পদোন্নতির মতো বাস্তব কারণেও অনেক মানুষ একই চাকরিতে থাকতে চান।

শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ—দ্রুত বদলে যাওয়া অর্থনীতিতে শুধুমাত্র আনুগত্যের ওপর ভরসা না করে, সচেতনভাবে ক্যারিয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here