Home বিশ্ব ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে প্রকৃত বিজয়ী রাশিয়া

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে প্রকৃত বিজয়ী রাশিয়া

414
0

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ যেন উভয় দেশের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার সামরিক সহায়তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করা—যা পুরোপুরি সফল হয়নি।

ইসরায়েল মূলত কর্মসূচির গভীরে আঘাত করতে পারেনি; ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কেবল বাইরের স্তর। বর্তমান পরিস্থিতিতে সময় ইসরায়েলের অনুকূলে নয়। তারা এখন কেবল ইরানের পারমাণবিক অগ্রযাত্রা বিলম্বিত করতে চায়, নির্মূল নয়। উপরন্তু, যুদ্ধের ভৌগোলিক প্রসার এতটাই বিস্তৃত যে তা পাকিস্তান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—এই যুদ্ধের প্রকৃতি কী? এর পরিণতি কী হতে পারে? এবং কেউ কি সত্যিকার অর্থে জয়ী হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, এ লড়াইয়ের প্রকৃত লাভবান হয়েছে রাশিয়া। যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্যবৃদ্ধি তাদের পক্ষে গেছে, ফলে রপ্তানি বেড়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধেও তাদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে।

অন্যদিকে, ইরান ও ইসরায়েল এমন একটি সংঘর্ষে জড়িয়েছে যার প্রভাব ও বিস্তার তাদের প্রত্যাশার বাইরে চলে গেছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধে হস্তক্ষেপ করেছে।

ভাবমূর্তির লড়াই

ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলা ছিল মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ ভাবমূর্তি ও মনোবলের ওপর প্রভাব ফেলতে। বোমা হামলা, বিজ্ঞানীদের মৃত্যু এবং নিখুঁত সামরিক অভিযানের ছবি—সব মিলিয়ে ইরানে মানসিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় বহু আরবের মাঝে ১৯৬৭ সালের সেই পুরনো ধারণা আবার দৃঢ় হয়—“ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অজেয়।”

কিন্তু ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া ছিল দৃঢ় ও স্পষ্ট। যদিও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল, তবু তেল আবিব ও হাইফায় ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য তাদের কাছে প্রতীকী বিজয় হিসেবে উপস্থাপিত হয়। আরব সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ইসরায়েলের ক্ষতিগ্রস্ত চিত্র, যা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেও ইরানের অগ্রগতি প্রমাণ করে।

এই লড়াই ইসরায়েলের ‘অজেয় সেনাবাহিনী’ ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ভবিষ্যতের আরব প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী ঐতিহাসিক চেতনা আবার জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

অস্ত্র ও প্রযুক্তির লড়াই

ইসরায়েলের রয়েছে শক্তিশালী বিমান ও প্রতিরক্ষা বাহিনী, যা তারা অতীতে হিজবুল্লাহ ও হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ইরান ও আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই আকাশ প্রতিরক্ষা গড়ে তোলেনি, ফলে তারা এই শ্রেষ্ঠত্বের মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছে।

তবে ইরান এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় তুলনামূলক সাফল্য দেখিয়েছে। ইসরায়েলের একটি F-35 যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করার ঘটনা তারই একটি দৃষ্টান্ত। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের বিমান শ্রেষ্ঠত্বে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।

ড্রোন ব্যবস্থাতেও দুই পক্ষই উচ্চমাত্রার প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ইসরায়েলের রয়েছে উন্নত এবং বহুস্তরবিশিষ্ট ড্রোন, আর ইরান এগিয়েছে ‘ট্র্যাকিং এভয়েডিং’ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোনে। ভবিষ্যতে ইরান ও আরব রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের ড্রোন সক্ষমতা আরও বাড়ায়, তবে ইসরায়েলের ভেতরের আকাশসীমা প্রথমবারের মতো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের অনুপ্রবেশও ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কৌশল ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

অবশ্যই, ইরানও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, যদিও তার প্রকৃত পরিমাণ এখনো নির্ধারিত নয়। অর্থনৈতিকভাবে তারা আরও চাপে পড়বে। অন্যদিকে, ইসরায়েলও এক ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধের মুখোমুখি হয়েছে। বিমান চলাচল বন্ধ, বন্দর জটিলতা—সব মিলিয়ে এ যুদ্ধ তাদের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

প্রশ্ন রয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে—তারা কি এই সংঘর্ষকে বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে থামাতে পারবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে বিষয়টি ধরতে পারেনি, তা হলো—ইরানি জনগণের মনোভাব। বাইরের আক্রমণের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, এমনকি নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয়। ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে ইরানিদের প্রতিক্রিয়া এ কথার প্রমাণ।

যদি ইরানকে সরাসরি ভাঙার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তারা হয়তো মার্কিন স্বার্থেই হামলা চালাতে বাধ্য হবে। এরই মধ্যে ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর তেহরান সেই হুমকি দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে। অনেক ইসরায়েলি নাগরিক নিরাপত্তার অভাবে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। এই অবস্থা ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যুদ্ধবিরতির পেছনে এটাই ছিল বাস্তবিক কারণ।

মানসিক পরাজয়, অনিশ্চিত বিজয়

ইরানের জন্য এই যুদ্ধ কোনো সরাসরি বিজয় এনে দেয়নি, তবে এটি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ও মানসিকভাবে এক বড় ধাক্কা। এই সংঘর্ষের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল ইসরায়েলের অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলে দিতে পারে।

নেতানিয়াহু জানেন, এই সংঘাত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের শেষ অধ্যায় হতে পারে। তাই একটি ‘গ্রহণযোগ্য ফলাফলে’ পৌঁছে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়েছেন।

যুদ্ধে জড়ালেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও হস্তক্ষেপ করেছে—তেল বাজারের চাপে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি করত। চীন এই যুদ্ধ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে রাশিয়া ও চীন নিজেদের জন্য সুযোগ খুঁজে পেয়েছে।

এই যুদ্ধ শেষ হয়েছে এমনভাবে, যেখানে কেউ একেবারে জয়ী বা পরাজিত নয়। কিন্তু সত্য হলো—এই যুদ্ধ এক ‘অমীমাংসিত সংঘর্ষ’-এর উদাহরণ, যা ভবিষ্যতের নতুন প্রজন্মের সামনে আরো অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বার্তা দিয়ে গেল। আর এর একমাত্র বাস্তব বিজয়ী—রাশিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here