Home বিশ্ব ‘যুদ্ধবিরতিতে’ ঘরে ফেরা, অনুভূতিতে তেহরানবাসীর কণ্ঠে ‘স্বর্গের স্বাদ’

‘যুদ্ধবিরতিতে’ ঘরে ফেরা, অনুভূতিতে তেহরানবাসীর কণ্ঠে ‘স্বর্গের স্বাদ’

385
0

তেহরানে প্রবেশের সড়কগুলো আবার ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। শহরমুখী গাড়িগুলোর ভেতর দেখা যাচ্ছে পরিবার, স্যুটকেস এবং এক ধরনের সতর্ক আশাবাদ— ‘হয়তো এবার ঘরটা নিরাপদ হবে’।

১২ দিন ধরে চলা যুদ্ধ, যা রাজধানী থেকে লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং ৬০০ জনের বেশি ইরানিকে প্রাণ হারাতে বাধ্য করেছে, সোমবার এক ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ক্ষতবিক্ষত তেহরানে ফেরার পথ খুলে দিয়েছে।

৩৩ বছর বয়সী নিকা ঘরে ফিরে কিছুটা স্বস্তি পেলেও, তিনি জানেন না এই যুদ্ধবিরতি কতটা টিকবে। সংঘর্ষের সূচনা ঘটে ১৩ জুন, যখন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় প্রথম হামলা চালায়। এরপর শুরু হয় দুই অঞ্চলের শক্তিধর দেশের মধ্যে পাল্টা আক্রমণের এক নজিরবিহীন পর্ব, যা এক দশকের মধ্যে প্রথমবার তেহরানকে সরাসরি যুদ্ধের কেন্দ্র করে তোলে।

সাধারণ মানুষের জীবন মুহূর্তেই পাল্টে যায়। ২৬ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাবা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে তার দিনগুলো ছিল ব্যস্ততায় ভরা— একসঙ্গে পড়াশোনা, চাকরি আর ব্যক্তিগত দায়িত্ব সামলাতেন। কিন্তু যুদ্ধের ফলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় পরীক্ষা, কাজ এবং বন্ধুবান্ধবের যোগাযোগ। একসময় তিনি নিজেকে গভীর একাকীত্বে আবিষ্কার করেন।

সাবা বলেন, প্রতিরাতে যখন বোমার শব্দ আর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গর্জন চলত, তখন আর নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতেন না। কোনো গাড়ির ব্যবস্থা না থাকায় তার বাবা মাশহাদের কাছে কোচান শহর থেকে এসে তাকে পারিবারিক বাড়িতে নিয়ে যান, যেখানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত তিনি অবস্থান করেন।

এখন, নিকা ও সাবার মতো অনেকেই ঘরে ফিরেছেন। কিন্তু ঘুমানোর শান্তির সঙ্গে থেকেই যাচ্ছে এক প্রকার অস্থিরতা— যদি আবারও গোলাবর্ষণ শুরু হয়?

ইরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১২ দিনের যুদ্ধে অন্তত ৬১০ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১,৫০০ জন, যাদের ৯০ শতাংশই সাধারণ মানুষ।

তেহরানের ব্যবসায়ী কামরান জানান, তিনি যুদ্ধকালীন শহর না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। দিনের বেলা সহনীয় হলেও, রাতে টানা বোমা হামলা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওয়াজ অসহনীয় হয়ে ওঠে।

অনেকের জন্য শহর ছাড়ার পথ ছিল ক্লান্তিকর— জ্বালানির সংকটে ফুয়েল স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, প্রধান সড়কগুলোতে যানজট।

যুদ্ধবিরতির পর তেহরানে ফিরে এসে নিকা জানান, ১১ জনের সঙ্গে আশ্রয়ে থাকার পর নিজের বিছানায় ঘুমানোর অনুভূতিই ছিল ‘স্বর্গীয়’, যদিও তিনি এখনও দ্বিধাগ্রস্ত— যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী হবে? তবে তিনি বলেন, “যুদ্ধ ফের শুরু হলেও আমি আর ঘর ছাড়ব না।”

সবাই অবশ্য নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেননি। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কেইভান সাকেত জানান, তার বাড়িতে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। বিস্ফোরণ না ঘটায় সম্পূর্ণ ধ্বংস থেকে বেঁচে গেলেও, দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে, এমনকি লোহার গেটও বিকৃত হয়েছে। যুদ্ধ সম্পর্কে সাকেত বলেন, এটি মানবজাতির সবচেয়ে বিকৃত সৃষ্টি।

যুদ্ধবিরতি চালু থাকলেও দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। তেহরানে ইসরায়েলি এবং ইসরায়েলে ইরানি হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

রাজনৈতিক বিজ্ঞান পড়ুয়া হামেদ কেরমান শহরে ফিরলেও আবারও ঘর ছাড়তে হতে পারে এই শঙ্কা তাড়া করছে তাকে। তবুও, শহরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরে আসছে— রাস্তায় বাড়ছে যানবাহন, খুলছে রেস্তোরাঁ-ক্যাফে, কর্মীদের অফিসে ফিরে আসার নির্দেশ দিচ্ছে কোম্পানিগুলো।

তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন প্রদেশ— আলবর্জ, পূর্ব আজারবাইজান, ইসফাহান, ফারস ও কেরমানশাহ— ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ১২ দিনের মধ্যে ইরানজুড়ে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও সাবার মতো অনেকে আশার আলো দেখছেন— কারণ স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসতে শুরু করেছে, যদিও যুদ্ধবিরতির ওপর শঙ্কার মেঘ এখনও রয়ে গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here