স্তন ক্যানসারের ভুল নির্ণয়ে বড় বিপদের মুখে পড়েছিলেন শিক্ষিকা ফিরোজা খাতুন। চিকিৎসকরা তাকে কেমোথেরাপি দেন এবং স্তন কেটে ফেলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। একপর্যায়ে চারটি কেমোথেরাপি সম্পন্ন হওয়ার পর, আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে তিনি ভারতের কলকাতায় যান। সেখানে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, ফিরোজার শরীরে আদৌ কোনো ক্যানসার নেই—তিনি পুরোপুরি সুস্থ।
এমন খবর শুনে দিশেহারা হয়ে যান ফিরোজা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কাকে বিশ্বাস করবেন—বাংলাদেশি চিকিৎসকদের, নাকি ভারতের? আর যেহেতু ক্যানসারই ছিল না, তাহলে আগে দেওয়া কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি তাকে আজীবন ভুগাবে না? এই মানসিক টানাপোড়েন আর দুশ্চিন্তায় কেটেছে তার জীবনের তিনটি বছর। এখন পুরোপুরি সুস্থ হলেও ফিরোজা মনে করেন, শুধু তিনি নন—তার মতো বহু মানুষ ভুল রিপোর্ট ও ভুল চিকিৎসার কারণে অকারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
২০১২ সালের মার্চে দেশে নামকরা দুটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার—মেডিনোভা ও আনোয়ারা মেডিকেল সার্ভিসেস—স্লাইড টেস্টের ভিত্তিতে জানান, তার ডান স্তনে ক্যানসার হয়েছে। এর ভিত্তিতে চার দফা কেমোথেরাপি ও অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। শেষমেশ কলকাতায় গিয়ে দেখা যায়, কিছুই হয়নি। অথচ দেশে নানা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা চলছিল।
ফিরোজা বলছেন, “না জানি আমার মতো আরও কত মানুষ ভুল চিকিৎসায় অঙ্গ হারাচ্ছেন বা অকালে জীবন হারাচ্ছেন। সবাইকে সচেতন হতে হবে।”
ভুল চিকিৎসার শিকার আরও অনেকেই
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা ফখরুল আলমের বড় ছেলে আহনাফ তাহমিদ ঢাকার একটি হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে মারা যায়। এ ঘটনার পর পরিবারটির মধ্যে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফখরুল আলম বলেন, “আমার স্ত্রীও এখন অসুস্থ, কিন্তু চিকিৎসকের কাছে যেতে রাজি না।” ছোট ছেলের খতনা করানোর সাহসও পাচ্ছেন না তিনি।
এই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে শুধুই ভুল চিকিৎসা, অবহেলা ও দায়বদ্ধতার অভাবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বজলুর রহমানও পেটের ব্যথার সমস্যায় বহু ডাক্তার দেখিয়েও রোগের সঠিক কারণ খুঁজে পাননি। প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে ওষুধ ও পরীক্ষার পেছনে লাখ টাকা খরচ করার পরও রোগ ধরা যায়নি। শেষমেশ ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়ে জানতে পারেন, তার কোলনে আলসার হয়েছে—যা দেশের কোনো ডাক্তার ধরতেই পারেননি।
চিকিৎসা নিতে বিদেশমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসকদের অনেকেই রোগীদের যথাযথ সময় দেন না। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল–এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে সবচেয়ে কম সময় ধরে চিকিৎসকরা রোগীদের দেখেন—বাংলাদেশ সেই তালিকায় অন্যতম। গড়ে একজন রোগীর পেছনে একজন ডাক্তার মাত্র ৪৮ সেকেন্ড সময় ব্যয় করেন।
এমন পরিস্থিতির কারণে প্রতিবছর ৮ লাখের বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান। এতে করে দেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে—যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতির কারণ।
চিকিৎসা ব্যবস্থায় নজরদারির অভাব
সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশেই নেই কার্যকর প্রশাসনিক তদারকি।
ঢাকার বাইরের অনেক হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কিংবা প্রশিক্ষিত জনবল। ফলে চিকিৎসা পেতে গিয়ে রোগীদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
২০২৪ সালে ঢাকার সাঁতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে মৃত্যু হয় ৫ বছর বয়সী শিশু আয়ান আহমেদের। পরিবার থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসাকে দায়ী করা হয়। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় এবং হাইকোর্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
তদন্ত শেষে কমিটি হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট দুই চিকিৎসককে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। শিশুটির পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের কথাও বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই সুপারিশগুলো কার্যকর হয়নি।
জবাবদিহির অভাবেই বাড়ছে বিশৃঙ্খলা
বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির অভাব, ভুল রিপোর্ট, অপর্যাপ্ত সময়, অযোগ্য জনবল এবং বাণিজ্যিক মনোভাব—এসব কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
তদন্ত হয়, সুপারিশ আসে—কিন্তু তার বাস্তবায়ন না হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় একধরনের অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে।










