Home Economics তেলের ধাক্কায় অস্ট্রেলিয়ায় স্ট্যাগফ্লেশনের শঙ্কা, আরবিএর নীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ

তেলের ধাক্কায় অস্ট্রেলিয়ায় স্ট্যাগফ্লেশনের শঙ্কা, আরবিএর নীতিতে বাড়ছে উদ্বেগ

54
0

অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সংকটের মুখোমুখি। বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক Reserve Bank of Australia (RBA)-এর নীতিনির্ধারণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করেছেন, বর্তমান নীতির কারণে দেশ “স্ট্যাগফ্লেশন”-এর দিকে এগোতে পারে— যেখানে একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বেকারত্ব বাড়তে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দামের ধাক্কা মোকাবিলায় সাধারণত দুই ধরনের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে।

প্রথম ব্যাখ্যায় বলা হয়, যদি অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তেলের দাম বাড়ে, তাহলে সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমানো কার্যকর হতে পারে। ২০০৭ সালের মতো পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত এভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।

তবে সমালোচকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা। কারণ এই মূল্যবৃদ্ধি মূলত বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে এসেছে, শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ চাহিদা থেকে নয়।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরবরাহ সংকটের কারণে তেলের দাম বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত সেই ধাক্কাকে সাময়িক হিসেবে বিবেচনা করে অতিরিক্ত কড়াকড়ি না করা। অনেক অর্থনীতিবিদ এটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফসল সংকটের সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সুদ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করতে পারে।

কিন্তু আরবিএ গভর্নর Michele Bullock জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সুদের হার বৃদ্ধি মূলত অর্থনীতির “অতিরিক্ত চাহিদা” এবং শক্তিশালী শ্রমবাজারের প্রতিক্রিয়া ছিল।

তবে সমালোচকরা বলছেন, শ্রমবাজারের তথ্য আরবিএর এই যুক্তিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তথ্যেও দেখা গেছে শ্রমবাজারের চাপ আগেই কমতে শুরু করেছিল এবং মজুরি বৃদ্ধিও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছিল।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, গত বছরের মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ ছিল না মজুরি বৃদ্ধি; বরং বিদ্যুতের দাম ও জ্বালানি ব্যয়ের তীব্র উল্লম্ফন।

গভর্নর বুলক নিজেও স্বীকার করেছেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধি একটি “এক্সোজেনাস সাপ্লাই শক”— অর্থাৎ বাইরের কারণে সৃষ্ট সংকট। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সুদের হার আরও বাড়ালে তা অর্থনীতির ওপর উল্টো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তাদের আশঙ্কা, চাহিদা দমন করতে গিয়ে আরবিএ পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়ছে।

২০২৬ সালের জন্য আরবিএ যে পূর্বাভাস দিয়েছে তাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারণা করছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ১.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে— যাকে অর্থনীতিবিদরা “স্টল স্পিড” বা প্রায় স্থবির অর্থনৈতিক অবস্থা হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের ধাক্কা অব্যাহত থাকলে কোভিড-পরবর্তী সময়ের মতো আবারও মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়লেও আয় সেই হারে বাড়ছে না।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ডিজেল সংকট নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি ডিজেলের সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার কৃষি, খনি ও পরিবহন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এতে সরবরাহ ব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে, কর্মসংস্থান কমবে এবং অর্থনীতি আরও দুর্বল হবে, অথচ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই থেকে যেতে পারে।

কিছু বিশ্লেষক এই সম্ভাব্য পরিস্থিতিকে “ডিপ্রেসফ্লেশন” বলে বর্ণনা করছেন— যেখানে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, উচ্চ বেকারত্ব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে দেখা দেয়।

সমালোচকদের আরেকটি অভিযোগ হলো, আরবিএ এখনো অতীতের তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে, যা সাম্প্রতিক সংকটগুলোতে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

তাদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময়ে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করলে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

যদিও আরবিএর সাম্প্রতিক সুদের হার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ৮-১ ভোটে অনুমোদিত হয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী মাসগুলোতে আরবিএকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে, নাহলে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here