Home এশিয়া পেসিফিক ‘শীতের ট্রাকে কাঁথা-কম্বল, বুকভরা স্বপ্ন’: সিডনিতে নাট্যআড্ডায় ফিরে দেখা সেই সোনালি দিনগুলো

‘শীতের ট্রাকে কাঁথা-কম্বল, বুকভরা স্বপ্ন’: সিডনিতে নাট্যআড্ডায় ফিরে দেখা সেই সোনালি দিনগুলো

386
0

সিডনির ডেনহ্যাম কোর্ট যেন হয়ে উঠেছিল নব্বইয়ের ঢাকার এক টুকরো মঞ্চ। প্রবাসের মাটিতে এক সন্ধ্যায় জমে ওঠে এক প্রাণবন্ত নাট্যআড্ডা—যেখানে অংশ নেন বাংলাদেশের নাট্যজগতের কিছু উজ্জ্বল মুখ।

মঞ্চে-টেলিভিশনে সমান দক্ষ অভিনেতা মাজনুন মিজান, ‘ঢাকা পদাতিক’-এর একসময়ের মুখ্য অভিনয়শিল্পী জন মার্টিন, মঞ্চ ও ছোট পর্দার অভিনেত্রী মৌসুমী মার্টিন এবং নির্মাতা শিহাব শাহীন—যিনি এই মুহূর্তে সিডনিতে মেয়েকে দেখতে এসেছেন—ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসাবিদ ড. সায়েদ আহমেদ ও প্রবাসী নির্মাতা শিমুল শিকদার।

স্মৃতির মঞ্চে ফিরলেন সবাই

আড্ডার শুরুতেই জন মার্টিন জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যজীবনের গল্প। “প্রথম বর্ষেই ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’-এ অভিনয় করি। এটি ছিল দেশের প্রথম ব্যঙ্গাত্মক মিউজিক্যাল নাটক,” স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে তিনি গেয়ে ওঠেন নাটকের গান।

মৌসুমী মার্টিন বলেন, “মঞ্চনাটকের গান এতটা প্রভাব ফেলত যে আসল গান ভুলে যেতাম। এখনো সেই সুর কানে বাজে।”

‘কাঁথা-কম্বল নিয়ে ট্রাকে ঢাকায় আসতাম’

নির্মাতা শিহাব শাহীন তাঁর নাট্যজীবনের সূচনার কথা জানিয়ে বলেন, “আমি ফেনীর সুবচন থিয়েটারে কাজ করতাম। শীতের রাতে কাঁথা-কম্বল নিয়ে নাটকের ট্রাকে করে ঢাকার উৎসবে যেতাম।”

তিনি আরও বলেন, “আমার প্রথম নাটক ‘আঁধিয়ার’ ফেনীতেই লেখা। তখন ‘ইঙ্গিত’, ‘খেপা পাগলা’—এই নাটকগুলো প্রাণে ভরপুর ছিল। ফেনীতে আমরা ‘ঢাকা পদাতিক’-এর নাটকও মঞ্চস্থ করতাম। তারা স্ক্রিপ্ট দিতে কৃপণতা করত না।”

নব্বইয়ের সেই সময়কে শিহাব শাহীন অভিহিত করেন মঞ্চনাটকের সোনালি দিন হিসেবে—এক নাটকীয় যুগ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ভরপুর।

রাতভর নাটক, ঘুমহীন ফিরে যাওয়া

মাজনুন মিজান বলেন, “নাটকের সেট ভেঙে আমরা গভীর রাতে গাবতলী গিয়ে সেখান থেকে নবীনগর হয়ে জাহাঙ্গীরনগর ফিরতাম। রাতের খাবারে থাকত তেলাপোকা-ঘেরা খাবার—তাই খেতাম না, ঘুমিয়ে পড়তাম।”

স্মরণ করেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব এস এম সোলায়মানকে—“সংগীতে ওনার অসাধারণ দখল ছিল। এখনো চোখে ভাসে তার শেষ সময়ের চেহারা।”

জন মার্টিন বলেন, “সোলায়মান ভাই এক অনন্য প্রতিভা। নাটকের রিহার্সালে জামিল ভাই যখন সংলাপ তৈরি করতেন, সোলায়মান ভাই সঙ্গে সঙ্গে তা সুরে রূপ দিতেন। সেসব দিন আজও মনে পড়ে!”

প্রবাসেও থেমে নেই সৃষ্টিশীলতা

২০০১ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা জন ও মৌসুমী মার্টিন এখনো নাটকের সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি জনের নির্দেশনায় একটি নাটকে মৌসুমীর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে।

এক মজার ঘটনার স্মৃতি শেয়ার করেন জন মার্টিন, “একবার গলা বসে যায়, আর সেদিনই জুয়েল আইচ ভাই আসেন নাটক দেখতে। বলি, জাদু দেখান, আমার গলা ভালো করে দিন! তিনি হেসে বলেন, ‘পাগল নাকি?’ শেষে জামিল ভাই সংলাপ ভাগ করে দিয়ে কোনোভাবে শোটা শেষ করেন।”

‘নাটক মানেই জীবন, যেখানেই হোক’

আড্ডার শেষদিকে নির্মাতা শিহাব শাহীন বলেন, “নাটক শুধু মঞ্চ নয়—এটা এক সময়, এক অনুভব, হৃদয়ের গভীর ভাষা। দেশ হোক বা বিদেশ, নাট্যজনেরা যেখানে মিলিত হন, সেখানেই শুরু হয় জীবনের নতুন এক নাটক।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here