ক্যানবেরা: অস্ট্রেলিয়ায় স্কুল, জাদুঘর, ক্রীড়া সংগঠন এবং শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে জীবাশ্ম জ্বালানি (ফসিল ফুয়েল) শিল্পের সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। একটি নতুন তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কয়লা, তেল ও গ্যাস খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত পৃষ্ঠপোষকতা ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের কাছে নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
Comms Declare-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অন্তত ২৬০টি শিক্ষা, খেলাধুলা, জাদুঘর, প্রারম্ভিক শিক্ষা কেন্দ্র এবং ক্যারিয়ার-উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান গ্রিনস পার্টি, স্বতন্ত্র সিনেটর ডেভিড পকক এবং বিভিন্ন জলবায়ু সংগঠন এ বিষয়ে সিনেট তদন্ত চালুর পাশাপাশি শিশুদের লক্ষ্য করে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতার ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে Comms Declare-এর প্রতিষ্ঠাতা বেলিন্ডা নোবেল অভিযোগ করেন, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো একদিকে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, অন্যদিকে শিশুদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, শিশুদের জ্বালানি ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক শিক্ষা কার্যক্রমে পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগ—যেমন পুনর্ব্যবহার, বিদ্যুৎ সাশ্রয় বা আলো বন্ধ রাখার মতো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও, জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন ও ব্যবহারের মাধ্যমে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে আড়ালে রাখা হয়।
প্রতিবেদনে কয়েকটি নির্দিষ্ট উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুইন্সল্যান্ড মিউজিয়ামের একটি শিক্ষা কর্মসূচি, যা শেল এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান Queensland Gas Company-এর অর্থায়নে পরিচালিত। এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যসামগ্রী তৈরি এবং শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
আরেকটি STEM কার্যক্রমে আট ও নয় বছর বয়সী শিশুদের রুটি, ভেজিমাইট এবং রঙিন স্প্রিংকল ব্যবহার করে সমুদ্রের তেল উত্তোলন প্ল্যাটফর্মের মডেল বানাতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের কার্যক্রম ছোটবেলা থেকেই বিতর্কিত শিল্পকে স্বাভাবিক ও ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করার ঝুঁকি তৈরি করে।
ক্রীড়া খাতেও জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কমিউনিটি স্পোর্টস অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের স্পনসর প্রতিষ্ঠানের প্রচারে কীভাবে ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা দিতে হয়।
গ্রিনস পার্টির সম্পদবিষয়ক মুখপাত্র স্টেফ হজকিনস-মে বলেন, শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রারম্ভিক শিক্ষা কেন্দ্র কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের কোনো প্রভাব থাকা উচিত নয়। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের প্রমাণভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নয়।
স্বতন্ত্র সিনেটর ডেভিড পককও এ বিষয়ে সংসদীয় তদন্তের দাবি সমর্থন করেছেন।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ম্যাডেলিন কিং শিল্পখাতের পৃষ্ঠপোষকতার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে সম্পদভিত্তিক কোম্পানিগুলো দেশটির বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনকে সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই সহায়তা অনেক স্থানীয় ক্লাবের টিকে থাকা এবং শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে Minerals Council of Australia-এর প্রধান নির্বাহী তানিয়া কনস্টেবল বলেন, খনিজ ও জ্বালানি শিল্পের ভূমিকা, পৃথিবীবিজ্ঞান এবং খনিশিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, দায়িত্বশীল খনিজ অনুসন্ধান ও উৎপাদন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানানো ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়ায় করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতার সীমা, শিক্ষাক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রভাব এবং শিশুদের জন্য নিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। গ্রিনস পার্টি পার্লামেন্টের শীতকালীন বিরতির আগে সিনেটে এ বিষয়ে তদন্তের প্রস্তাব উত্থাপনের পরিকল্পনা করেছে।











