ঢাকা: দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তা, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ১ জুলাই। ২০২০ সালের এই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
বাংলাদেশের করপোরেট অঙ্গনে সততা, নৈতিকতা ও সুশাসনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন লতিফুর রহমান। দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনে তিনি শুধু সফল উদ্যোক্তা হিসেবেই নয়, বরং ন্যায়নিষ্ঠ ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সম্মান অর্জন করেন।
১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করা লতিফুর রহমানের শিক্ষাজীবনের সূচনা ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে। পরে তিনি ভারতের শিলংয়ের সেন্ট এডমন্ডস স্কুল এবং কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন। দেশে ফিরে ১৯৬৬ সালে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউ রহমান জুট মিলসে নির্বাহী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৭২ সালে টি হোল্ডিংস লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চা রপ্তানি ব্যবসায় প্রবেশ করেন তিনি। এরপর ১৯৮৭ সালে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ট্রান্সকম গ্রুপ, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ, ভোগ্যপণ্য, পানীয়, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, চা, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে ট্রান্সকম বেভারেজেস আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাফল্য অর্জন করে। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি বহুজাতিক কোম্পানি পেপসিকোর পক্ষ থেকে ‘গ্লোবাল বটলার অব দ্য ইয়ার ২০১৬’ সম্মাননা লাভ করে।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি দেশের জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক প্রথম আলো এবং ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নৈতিক ব্যবসা পরিচালনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে নরওয়ে-ভিত্তিক বিজনেস ফর পিস ফাউন্ডেশন তাঁকে সম্মানজনক অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এছাড়াও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অসংখ্য সম্মাননা ও স্বীকৃতি অর্জন করেন।
কর প্রদানে দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সিনিয়র সিটিজেন ক্যাটাগরিতে ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তিনি সর্বোচ্চ করদাতার সম্মাননা লাভ করেন।
ব্যবসায়িক নেতৃত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি Metropolitan Chamber of Commerce and Industry (MCCI)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া Federation of Bangladesh Chambers of Commerce and Industry (FBCCI) এবং International Chamber of Commerce Bangladesh-সহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
লতিফুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনেও এক গভীর ট্র্যাজেডি রয়েছে। তাঁর নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেন ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানের Holy Artisan Bakery attack-এ উগ্রবাদী হামলায় নিহত হন। ফারাজ ছিলেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমানের ছেলে।
ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশের ব্যবসায়িক মহল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে লতিফুর রহমানকে স্মরণ করছে। অনেকের মতে, সততা, নৈতিকতা, করপোরেট সুশাসন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার যে মানদণ্ড তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।











